লকডাউনে বহু পরিবারের মুখে যে ঠিকমত পুষ্ঠিকর খাবার পড়ছে না তা ইতিমধ্যেই একাধিকবার সামনে এসেছে। যদিও, সেই সব খবরের জেরে স্থানীয় প্রশাসন তড়িঘড়ি দুর্গতদের কাছে ত্রাণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা পৌঁছে দিয়েছে। তবু, পরিস্থিতি যে হাতের মধ্যে নেই তার প্রমাণ ফের মিলল। যার জেরে শুরু হয়েছে অনাহার বিতর্ক। কারণ, পুরুলিয়ার পাড়া ব্লকের শাকড়া গ্রামে ১০ বছরের এক শিশুর মৃত্যুতে অনাহারের অভিযোগ করেছে পরিবার। তাদের অভিযোগ, তিন দিন ধরে ঘরে রান্না করার মতো কিছুই ছিল না। প্রায় অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটছিল। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার সকালে ওই বালকের মৃত্যু হয়। 

জানা গিয়েছে শেখ শাকিল নামে বছর ১০ ওই বালক শনিবার সকাল থেকেই বমি করছিল। একবার পীত বমি করতেই সকাল ৮টার সময় বাবা শেখ রহিম এবং এলাকার আরও কিছু লোক শাকিল-কে স্থানীয় উপস্থাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বেডে কিছুক্ষণ শুয়েছিল শাকিল। অভিযোগ, এরপরই নাকি আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ে জ্ঞান হারায় সে। নার্সরা ছুটে এলেও কিছু-ই করা যায়নি। নার্স-রে দেখে নাকি জানান যে শাকিলের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেই সময় চিকিৎসক ছিল না। তবে, শাকিলের বাবা শেখ রহিম স্পষ্টতই সংবাদমাধ্যমের সামনে জানিয়েছেন যে অনাহারেই তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে। 

 

 

পেশায় রিক্সা চালান শেখ রহিম। লকডাউন ঘোষিত হতেই রিক্সা চালানো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে, দিন-আনা দিন খাওয়া পরিবারটিতে অর্থোপজানের কোনও জায়গা নেই। এই পরিস্থিতিতে ষোল থেকে আঠারো দিন আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু চাল-ডাল দেওয়া হয়েছিল। সেই খেয়েই ছিল শাকিলের পরিবার। কিন্তু, চারদিন আগেই সেই চাল-ডাল ফুরিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন শেখ রহিম। এরপর থেকে-ই তিনি এবং তাঁর পরিবার অভুক্ত অবস্থায় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন।

 

 

শাকিলের মৃত্যুর পিছনে সত্যি সত্যি অনাহার দায়ী কি না তা এখনও প্রমাণ হয়নি। কারণ, হাসপাতাল থেকে শাকিলের ডেথ সার্টিফিকেট মেলেনি। এমনকী স্থানীয় বিডিও থেকে জেলাশাসকের দফতর-কোথাও থেকে কোনও সরকারি বিবৃতি আসেনি। যদিও, শাকড়াা গ্রামের শেখ ইউসুফ নামে এক রাজনৈতিক নেতা বিডিও-কে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, শুক্রবার পাড়ার বেশকিছু পরিবারের চাল ও ডাল সংস্থানের জন্য তিনি বিডিও-র দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ব্লক আধিকারিককে শাকড়া গ্রামের কিছু মানুষের অভুক্ত থাকার কথাও নাকি তিনি বলেছিলেন। সেই শুনে বিডিও নাকি বলেছিলেন নতুন করে চাল-ডাল নিতে গেলে কর্মাধ্যক্ষের স্বাক্ষর লাগবে। এরপর শেখ ইউসুফ কর্মাধ্যক্ষের স্বাক্ষর নেন। কিন্তু তিনি নাকি জানতে পারেন ততক্ষণে বিডিও অফিসে তালা পড়ে গিয়েছে এবং সেদিন আর কোনও চাল-ডাল দেওয়া হবে না। এরপর ওই লোকজনকে সঙ্গে করে এলাকায় ফিরে আসেন শেখ ইউসুফ। তাঁর সাফ দাবি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে লকডাউনে গরিব ও আর্থিকভাবে দূর্বল পরিবারগুলিকে সর্বোতভাবে সাহায্য করতে বলছেন, তখন ব্লক আধিকারিক কীভাবে চাল ও ডাল আটকে রাখতে পারেন

 

 

এই বিষয়ে ব্লক আধিকারিকের দফতর থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। গোটা বিষয়েই আপাতত মৌনতা বজায় রেখেছে প্রশাসন। সূত্রের খবর শাকিলের মৃত্যুর খবর চাওড় হতেই পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়েছিল। যদিও, পুলিশও কিছু জানায়নি। রাজ্যে অনাহারে মৃত্যুর অভিযোগ বহু হইচই হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও জনসমাবেশে দাবি করেছেন যে রাজ্যে এখন অনাহারে মৃত্যু হয় না। মুখ্যয়মন্ত্রী পদে তাঁর দায়িত্বগ্রহণের পর জঙ্গলমহলে-র তিন জেলাতেই উন্নয়নের জোয়ার লেগেছে বলেও বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন তিনি। জঙ্গলমহলে ২টাকা কেজি দরে চালও দেওয়া হয়। লকডাউনের জন্য ফ্রি-রেশনেরও বন্দোবস্ত রয়েছে। তাহলে, শাকিলের পরিবার ৩ দিন ধরে অভুক্ত হয়ে কেন থাকল? তাহলে কি শেখ রহিমের পরিবার রেশনও পাচ্ছে না? একাধিক প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর নেই। বর্তমান শাসকদলের মতে, রাজ্যে শেষ অনাহারের মৃত্যু আমলাশোলে। যা ঘটেছিল বাম আমলে। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। শুধু বামেরাই নয় পুরুলিয়া একটা সময় রাজ করে আসা কংগ্রেস, ফরওয়ার্ড ব্লক বা বর্তমানে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি কেউই এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেয়নি।