লোকসভা নির্বাচনের ছয় দফা হয়ে গিয়েছে। এখন পড়ে রয়েছে সপ্তম দফা। আর এই দফার মধ্যে দিয়েই শেষ হবে লোকসভা নির্বাচন। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রেও এই সপ্তম দফায় ভোট হবে। তার আগে সোমবার যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের দক্ষিণ সোনারপুরে একটি রোড শো-র আয়োজন করা হয়েছিল তৃণমূল প্রার্থী মিমি চক্রবর্তীর সমর্থনে। এই রোড শো-এর মধ্যমণি ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই রোড শো-তেই তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলা কাউন্সিলারকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটল। এই ঘটনায় ওই কাউন্সিলার সোনালী রায় এতটাই অপমানিত ও লজ্জিত বোধ করেন যে তিনি রোড শো থেকে বেরিয়ে যান। এই পুরো ঘটনাটাই ঘটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা তৃণমূল সভাপতি শুভাশিষ চক্রবর্তীর সামনে। 

সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাাউন্সিলার সোনালী রায়। তিনি জানিয়েছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্যাবলোর পাশেই তিনি ছিলেন। কিন্তু, ট্যাবলোর পাশ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েক জন সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এই নিয়ে হালকা বচসাও হয়। জানা গিয়েছে, হরিনাভির কেদার আশ্রমের কাছে রোড শো পৌঁছতেই সোনালী রায়কে ধাক্কা দেওয়া হয়। এতটাই জোরে ধাক্কা মারা হয় যে তিনি রাস্তার ধারে পড়ে যান। কয়েক জন এসে তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু, উঠে দাঁড়ালেও আর ট্যাবলোর কাছে সোনালী রায়কে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অপমানে ও লজ্জায় শেষমেশ তিনি রোড শো থেকে বেরিয়ে আসেন বলে জানিয়েছেন সোনালী। 

গোটা ঘটনায় কোনও গোষ্ঠী কোন্দল বা বিশেষ কারোর নাম তিনি মুখে আনতে চাননি। তবে, গোটা ঘটনাতেই ক্ষুব্ধ সোনালী। লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই তিনি দলের জন্য লাগাতার প্রচার করে যাচ্ছেন। তৃণমূল প্রার্থী মিমি চক্রবর্তীর জন্য জনসমর্থন জোগাড়ে তিনি এলাকা এলাকায় মিটিং ও মিছিল করছেন। স্ট্রিট কর্নারগুলোতে বক্তব্যও রেখেছেন। সুতরাং, লোকসভা নির্বাচনে এবার প্রাণপাত পরিশ্রম করার পরেও এদিন রোড শো-তে যেভাবে তাঁকে জেলা নেতৃত্ব শুধু নয় সর্বভারতীয় স্তরের নেতার সামনে নিগ্রহ করা হল তা মেনে নিতে পারছেন না সোনালী। উপযুক্ত সময়েই তিনি এ ব্যাপারে দলীয় নেতৃত্বের কাছে নালিশ জানাতে চান। 

ক্ষুব্ধ সোনালী জানিয়েছেন, তিনি একজন কাউন্সিলর-ই শুধু নন, তিনি জেলা যুব সংগঠনের নেত্রীও। সুতরাং তাঁর এক পদমর্যাদাও রয়েছে। এদিনের ঘটনা তাঁর সেই পদমর্যাদাকেও ক্ষুণ্ণ করেছে বলে মনে করছেন তিনি। এই ঘটনায় জেলা যুব সংগঠনের এক পদস্থ নেতা যে জড়িত তার ইঙ্গিত দিয়েছেন সোনালী। 

দলের কাউন্সিলারকে যখন ধাক্কা মেরে রাস্তার উপরেই ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে তখন ট্যাবলোতে অভিষেকের সঙ্গেই ছিলেন যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী মিমি চক্রবর্তী এবং দক্ষিণ সোনারপুর বিধানসভার বিধায়িকা ফিরদৌসি বেগম। এঁদের কেউই সোনালী নিগ্রহের ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করতে না পারলেও সাক্ষী ছিলেন রাজ্য়সভার তৃণমূল সাংসদ তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি শুভাশিস চক্রবর্তী। এশিয়ানেট নিউজ বাংলার পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলা হয়। শুভাশিস আসল ঘটনা মানতেই চাননি। সোনালী রায়-কে দলেরই কিছু সদস্য যে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল তা সরাসরি উড়িয়েও দেন তিনি। তিনি দাবি করেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পান। তাঁর দেহরক্ষীরা সবাইকে তাঁর কাছে ঘেঁষতে দেন না। ট্যাবলো ঘিরে অভিষেকের দেহরক্ষীরা দড়ি ধরে বেষ্টনী করে রেখেছিল। তাঁদেরই ধাক্কা-তে সোনালী ছিটকে যান বলে শুভাশিসের দাবি। এমনকী তিনি এমনও দাবি করেন যে এই দেহরক্ষীদের জন্য তিনিও মাঝে-মধ্যে অল্পবিস্তর আহত হয়েছেন। 

বিশ্বস্ত সূত্রে দাবি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূল কংগ্রেসে দীর্ঘদিন ধরেই গোষ্ঠী কোন্দল রয়েছে। শোভন চট্টোপাধ্যায় জেলা সভাপতি-র দায়িত্বে থাকার সময়-ই এই গোষ্ঠী কোন্দল চরম আকার নিয়েছিল। শোভন চট্টোপাধ্যায়ের হাত থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দায়িত্ব শুভাশিস চক্রবর্তীর হাতে সমর্পণ করেছিলেন। কারণ, ততদিনে শোভনগোষ্ঠী বনাম অভিষেকের যুব তৃণমূলের মধ্যে কোন্দলের জেরে জেলা জুড়েই হিংসার বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। ক্য়ানিং-এ যার জন্য দফায় দফায় সংঘর্ষ বেঁধেই থাকছিল। এতে এক স্কুল ছাত্র-সহ কয়েক জন খুনও হয়ে যান। শুভাশিস চক্রবর্তী দায়িত্ব নেওয়ার পর মনে করা হয়েছিল যে এই কোন্দল অনেকটাই কমবে। কিন্তু, জেলা তৃণমূলের একটা অংশের দাবি, এই কোন্দল মেটেনি। উল্টে যেটা হয়েছে যারা ব্রাত্য ছিল তাঁরা ব্রাত্যই রয়ে গিয়েছে। বরং শোভনগোষ্ঠীর অধিকাংশ লোকজনই যুব তৃণমূলের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের বাজারে এদিন যে হেভিওয়েট রোড শো ছিল তাতে যাতে এই দুই গোষ্ঠীর বাইরে থাকারা যাতে প্রবেশ করতে না পারে তার উপরে সতর্ক নজর রাখা হয়েছিল। যার জন্য তৃণমূল কাউন্সিলার সোনালী রায়কে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। 

সোনালী রায় নিগ্রহের ঘটনায় সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার সহকারী চেয়ারপার্সন শান্তা সরকারের দাদা সঞ্জীব সরকার ওরফে পিঙ্কু-র নাম উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে, পিঙ্কুর লোকজনই সোনালীকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দেয়। যদিও, এই নিয়ে পিঙ্কুর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একটা সময় শোভন চট্টোপাধ্যায়ের অতি ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই পিঙ্কু। দাদা-বোনের দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব একটা অংশও তিতিবিরক্ত। সোনালী রায় পিঙ্কু বিরোধী গোষ্ঠী-র সঙ্গে ওঠাবসা করেন। সেই রাগেই এদিন সোনালীকে নিগ্রহ করা হয়েছে বলে খবর। 

গোটা ঘটনায় অবশ্য জেলা নেতৃত্বের অনেকেই শুভাশিস চক্রবর্তীকে ক্লিনচিট দিতে রাজি নন। কারণ, লোকসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণার দিন কয়েক আগে ক্যানিং-এ এক মহিলা প্রধানকে লাথি মেরে মঞ্চ থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিলেন এক স্থানীয় তৃণমূল নেতা। এই ঘটনাও ঘটে শুভাশিসের সামনেই। কিন্তু, তাতে ওই তৃণমূলনেতার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টে সে সময় শুভাশিস অভিযুক্ত তৃণমূলনেতাকেই ক্লিনচিট দিয়েছিলেন এবং লাথি মারার কথা অস্বীকার করেছিলেন।