নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল কলকাতা হাইকোর্টে। নিজের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে সারপ্রাইজ ভিজিটে গেলেন প্রধান বিচারপতি টিবিএন রাধাকৃষ্ণণন। সোমবার দুপুরে এই সারপ্রাইজ ভিজিটের ঘটনা ঘটে। নিজের চেম্বার থেকে বেরিয়ে দুপুর ১টা নাগাদ প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের অলিন্দ দিয়ে হাঁটা শুরু করেন। এভাবে প্রধান বিচারপতি-কে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখে অনেকেই তটস্থ হয়ে পড়েন। কারণ সচারচর এভাবে প্রধান বিচারপতি অলিন্দ দিয়ে হাঁটেন না। নিজের এজলাসে গেলে বা কোনও গুরুত্বপূর্ণ মিটিং-এর জন্য তিনি চেম্বার থেকে বাইরে আসেন ঠিকই, তবে হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসাটার মতো ঘটনা সচারচর ঘটে না। হাইকোর্টের কর্মীরা সকলেই অবাক হয়ে যান। প্রধান বিচারপতি তাঁর এই সারপ্রাইজ ভিজিটের সময় অনেকের সঙ্গেই কুশল বিনিময় করেন। শেষমেশ একতলায় সেন্ট্রাল ফাইলিং সেকশনে ঢুকে পড়েন। সেখানে বেশকিছুক্ষণ কর্তব্যরত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। খোঁজ খবর নেন কেস ফাইলিং-এর বিষয়ে। এরপর তিনি নিজের চেম্বারে ফিরে যান। 

প্রধান বিচারপতি টিবিএন রাধাকৃষ্ণণনের এই সারপ্রাইজ ভিজিট নিয়ে একটা প্রশ্ন অবশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে। আর সেটি হল প্রধান বিচারপতি-র এই সারপ্রাইজ ভিজিটের কারণ কি? এমনকী তাও আবার সেন্ট্রাল ফাইলিং সেকশনে! কানাঘুষোয় কলকাতা হাইকোর্টের অন্দরেই খবর যে লকডাউনে এই অচলাবস্থায় সেন্ট্রাল কেস ফাইলিং-এর সেকশনের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। এই সব অভিযোগ প্রধান বিচারপতি-র চেম্বারেও পৌঁছেছে। অভিযোগ উঠেছে, সেন্ট্রাল কেস ফাইলিং সেকশনে অর্থের বিনিময়ে মামলার তালিকা উপরের দিকে করে দেওয়া হচ্ছে। আর এই দুর্নীতির সঙ্গে সেন্ট্রাল কেস ফাইলিং সেকশনের বেশকিছু কর্মী জড়িত। এর সঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টের অন্যান্য বিভাগের কিছু কর্মী এবং হাইকোর্টের নিত্যদিনের কাজের সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষ যারা তথাকথিতভাবে সরকারি কর্মী নন তারাও জড়িত রয়েছে। লকডাউন এবং করোনা আতঙ্কের জন্য অধিকাংশ এজলাস বন্ধ রয়েছে। শুধুমাত্র এই মুহূর্তে তিনটি এজলাস খোলা রাখা হয়েছে। আর এই সব এজলাসে জরুরি মামলার শুনানিগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ, কোন মালরা শুনানি আগে হবে তাকে প্রভাবিত করার জন্য অর্থ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে, বেশকিছু মামলাকারী নানা জায়গায় এই নিয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগও জানিয়েছেন। লকডাউনের বাজারে দ্রুত মামলার শুনানির জন্য চড়াভাবে দর হাকা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। ইতিমধ্যেই সেন্ট্রাল কেস ফাইলিং-এর কিছু কর্মীকে আঁতসকাঁচের তলায় ফেলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির সারপ্রাইজ ভিজিটের সঙ্গে এইসব অভিযোগের কোনও যোগ আছে কি না তা স্পষ্ট নয়। আর প্রধান বিচারপতি-র দফতর থেকেও এ বিষয়ে কিছু সরকারিভাবে জানানো হয়নি। তবে, আচমকাই সেন্ট্রাল ফাইলিং সেকশনে প্রধান বিচারপতি টিবিএন কৃষ্ণণনের হাজির হওয়াটা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।  

অভিযোগ সিভিল স্যুটের ক্ষেত্রে মামলার তালিকাকে প্রভাবিত করা হচ্ছে সেন্ট্রাল ফাইলিং সেকশনে। লকডাউনের মধ্যে যেহেতু তিনটি মাত্র এজলাস খোলা রয়েছে, সেই কারণে জোর-বিজোর সংখ্যার ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্টের মামলাগুলিকে ভাগ করা হয়। এর জন্য সেন্ট্রাল ফাইলিং সেকশনে একটি পুল আছে- সেই পুলে সমস্ত মামলা নথিভুক্ত হয়। এই পুল থেকে ক্রমিক সংখ্যার ভিত্তিতে মামলাগুলিতে তিনটি এজলাসে পাঠানো হয়। অভিযোগ, দেখা যাচ্ছে পুল- যে মামলা উঠতে হয়তো ৭ দিন সময় লাগবে, অর্থ নিয়ে সেই মামলার ক্রমিক সংখ্যাকে হেরফের করে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 

সম্প্রতি হাইকোর্টেই এক জালিয়াত চক্রকে হাতেনাতে পাকড়াও করেছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। লকডাউনের মধ্যেও এই জালিয়াত চক্র হাইকোর্টে চাকরি করে দেওয়ার নাম করে একাধিক মানুষের কাছ থেকে লক্ষ-লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। ঘটনার তদন্তে যে মূল অভিযুক্তের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তার সঙ্গে হাইকোর্টের একাধিক দফতরের যোগাযোগ ছিল। এই সব দফতরগুলিতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল জালিয়াত চক্রের মাস্টারমাইন্ডের। ইতিমধ্যেই তদন্তে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এমনকিছু নাম পেয়েছে যাদের সঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টের কিছু কর্মীরও যোগাযোগ রয়েছে।