মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন কাটমানি নেওয়া নেতা-নেত্রীদের দলে তিনি রাখবেন না। এই নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই এখন জেলায় জেলায় কাটমানি নেওয়া নেতা-নেত্রীদের নাম সামনে আসছে। এমনকী কাটমানি নিয়ে নবান্নে টোলফ্রি নম্বরও খোলা হয়েছে। যেখানে সাধারণ মানুষ অভিযোগ জানাতে পারেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কাটমানি ইস্যুতে এতটাই কড়া অবস্থান নিয়েছেন যে তাতে এখন ত্রাহি রব পড়েছে। আর এই কাটমানির গেরোয় পদ খোয়াতে হল সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার ভাইস-চেয়ারপার্সন শান্তা সরকারকে। 

ছিলেন ভাইস-চেয়ারপার্সন, শনিবার থেকে তিনি পরিণত হলেন সাধারণ এক কাউন্সিলারে। শান্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এতটাই প্রবল যে তাঁকে পুরসভার কোনও দায়িত্বে রাখা হয়নি। আপাতত তিনি সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের একজন সাধারণ কাউন্সিলার হিসাবেই কাজ করবেন। শান্তার কাছে ছিল বিল্ডিং প্ল্যানিং, পিএনসিপি, সাধারণ প্রশাসন ও মিউটেশনের মতো দফতর। এগুলি সবই তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার পক্ষ থেকে শুক্রবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে পৌরপ্রধান পারিষদ নতুন করে গঠনের কথা জানানো হয়েছে। এতে শান্তার নাম কোথাও নেই। পৌরপ্রধান পারিষদ-এর পুনর্গঠনের পর যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে পৌরপ্রধান ডক্টর পল্লব দাসের নাম সবার উপরে রয়েছে। এরপরে রয়েছে নজরুল আলি মণ্ডল, বিভাস মুখোপাধ্যায়, রঞ্জিত মণ্ডল, অমিতাভ চৌধুরী, কার্তিক বিশ্বাস। এই তালিকার কোথাও শান্তা সরকারের নামই নেই। 

ভাইস-চেয়ারপার্সন শান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরেই পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই নিয়ে বহুবার বহু মানুষ অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। অভিযোগ, মিউটেশন, ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে নানা কাজে কাটমানি নিতেন শান্তা সরকার। তাঁর নেতৃত্বে সোনারপুর-রাজপুর পুরসভায় একটি চক্রও তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ। শান্তা সরকারকে সামনে রেখে এই কাটমানির পুরো চক্রটাই চলে সঞ্জীব সরকার ওরফে পিঙ্কু-র আঙুলিতে বলেও অভিযোগ। সঞ্জীব সরকারের বোন হলেন শান্তা। সঞ্জীবের স্ত্রী আবার কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ভাইঝি। যার জেরে খোদ তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে এই ভাই-বোন জুটির দুর্নীতি নিয়ে অনেকেই সরব হয়েও বিশেষ কিছু করতে পারেননি। কারণ, শোভন চট্টোপাধ্যায় তখন ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি। 

অভিযোগ, যে কোনও ধরনের ট্রেড লাইসেন্স করতে বা মিউটেশন করাতে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হত। কেউ এলাকায় কোনও ছোট কারখানা খুলতে চাইলেও অন্তত ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হত বলেও অভিযোগ। কেন্দ্রীয় অর্থ সাহায্যে গরিবদের জন্য যে আবাস যোজনা রয়েছে তাতেও শান্তা দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ। 

সম্প্রতি শান্তার দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছিলেন সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার পুরপিতা ডক্টর পল্লব দাস। তাঁকে বাড়িতে ঢুকে স্ত্রী ও মেয়ের সামনে শান্তার দাদা সঞ্জীব সরকার ও তাঁর দলবল হেনস্থা করে বলেও অভিযোগ। এমনকী পৌরপ্রধানকে থুঁতুর ছিঁটেও দেওয়া হয়। এই ঘটনায় এতটাই অপমানিত বোধ করেছিলেন ডক্টর পল্লব দাস যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সোনারপুর-রাজপুর পুরসভায় পা রাখেননি। 

দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি শুভাশিস চক্রবর্তী-র কাছেও শান্তা সরকারের দুর্নীতি নিয়ে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়েছে। লোকসভা নির্বাচন থাকায় এই নিয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখেছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা তৃণমূল কংগ্রেস। তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমার পিছনে অনেকেই কাটমানি ও তোলাবাজি-কে দায়ী করেছেন। এরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাটমানি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়ে আসছেন। আর সেই কারণেই এবার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হল শান্তা সরকারের। তাঁকে ফোন করা হলেও তা বন্ধ বলে বার্তা এসেছে। এমনকী, এই নিয়ে সোনারপুর-রাজপুর পুরসভার পৌরপ্রধান ও তাঁর পারিষদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ-ই ফোন ধরেননি।