ছবির নামঃ থাপ্পড়
পরিচালকঃ অনুভব সিনহা
অভিনেতা-অভিনেত্রীঃ তাপসী পান্নু, দিয়া মির্জা, পাভেল গুলাটি
প্রযোজক সংস্থাঃ ভূষণ কুমার-অনুভব সিনহা প্রযোজনা

গল্পঃ বৈবাহিক জীবন, ভালোই চলছিল। দেখাশোনা করে বিয়ে, এরপর ছোট ছোট চাওয়া পাওয়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্কে আগলে রেখেছিলেন তাপসী পান্নু ও পাভেল। অন্তরায় হল একটা থাপ্পড়। বিয়ের সম্পর্ককে ভাঙতে ভাঙতে কাঠগোড়ায় নিয়ে তুলল। বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে কী একটা থাপ্পর যথেষ্ট! এখান থেকেই বদলে যায় গল্পের মোড়। 

অভিনয়ঃ চেনা ছকেই পর্দায় ধরা দিলেন তাপসী পান্নু। ছবিতে প্রতিটি ফ্রেমেই যেন তিনিই সেরা। সংলাপ উপস্থাপনা থেকে শুরু করে অভিনয় দক্ষতা, সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম কাজেই ছবিকে ভরিয়ে তুললেন অভিনেত্রী। সাধারণ মেয়ের লুকে এক সাধারণ বার্তাই যেন অসাধারণ করে তুললেন তাপসী। ছবির পরতে-পরতে যা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়। পাশাপাশি পাভেলও ভারসাম্য বজায় রেখেই অভিনয় চালিয়ে গেলেন। 

চিত্রনাট্যঃ খুব সামান্য বিষয়কে ছবির প্রেক্ষাপটে অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিতে। যা সামাজিক প্রেক্ষাপটে অতি-প্রাসঙ্গিক। যা আত্মসন্মানের কথা বলে। মানিয়ে নেওয়ার মাত্রার কথা বলে। কোথাও গিয়ে বোধ হয় থেমে যেতে হয়, সঠিকে ফল সর্বদা সুখদায়ক হয় না, সব কেন উত্তর থাকে না, কার কাছে কোনটা সীমা নির্ভর করে তাঁর নেওয়ার ক্ষমতার ওপর, সহ্য শক্তির ওপর। এমনই বিষয়গুলি অতি সহজেই স্থান পেয়েছে ছবির পর্দায়। 

সিনেমাটোগ্রাফিঃ ছবির ক্যামেরা চাহিদা অনুপাতে সঠিক। যেখানে যতটা প্রয়োজন, কারুকাজ ঠিক ততটাই নজর কাড়ে। এডিটিং- ছবির দুই অধ্যায়ে কালার কারেকশন বেশকিছুটা ভিন্ন। চিত্রনাট্যের চাহিদা অনুযায়ী ছবিকে খুব যত্নের সঙ্গে এডিট করা হয়েছে। প্রতিটি ধাপে ধারালো সংলাপের সঙ্গে কাট টু কাট এডিট যেন দর্শকের মনযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। 

কথা ও গানঃ এক টুকরা ধুপ... গানটি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আসার পরই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। গানটি গেয়েছেন রাঘব চৈতণ্য। গানের কথা লিখেছেন শাকিল আজমি, মিউজিক দিয়েছেন- অনুরাগ সকিয়া। ছবির ভাব-আবেগ এক কথায় তুলে ধরছে এই গানটিই যথেষ্ট, যা ছবির প্রতিটি ধাপে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। 

পরিচালনাঃ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনও রকমের খামতি রাখতে নারাজ পরিচালক, তা ছবির প্রতিটি ধাপেই নজর কাড়ে। গল্পকে উপস্থাপনা করার কৌশল অনবদ্য। ছবিতে একদিকে সমাজ ও একদিকে এক নারীর আত্মমর্যাদাকে খুব যত্নের সঙ্গে পরিচালক উপস্থাপনা করেছেন। ভারসাম্য বজায় থেকেছে ছবির দুই অধ্যায়ে। 

সমালোচনাঃ চিত্রনাট্যের অনবদ্য উপস্থাপনার সঙ্গে অভিনয়ের মেলবন্ধন থাপ্পড়। বিয়ের পর সব কিছুই হতে পারে, প্রকৃতই কী এটা সঠিক, সমাজের নিয়ম নীতি, শিক্ষা অগ্রগতি তো সাময়িক, বাকি ছবিটা নিত্যদিন ফুঁটে ওঠে খবরের শিরোনামে। যেখানে মেয়েদের পরিবারে থেকেই শিখিয়ে পাঠানো হয় মানিয়ে নেওয়ার কথা, সম্পর্ক ভাঙলে কাঠগোড়ায় দাঁড় করানো হয় একটা মেয়ের সহ্য শক্তিকে, সেই অন্ধকার দিককে তুলে ধরেই এই ছবি সব দিক থেকেই কোনও খামতির অবকাশ রাখেনি। 

বিশ্লেষণঃ আড়াই ঘন্টার এই ছবি মূলত সেই সমাজের কথা বলে, যেখানে ছোট থেকে একটি মেয়েকে বড় করা হয় এই কথা বলে, যে মানিয়ে নিতে হয়। সহ্য করতে জানতে হয়। ধরে রাখতে শিখতে হয়। আর সেই সব নীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েই তাপসীর স্পষ্ট সংলাপই যেন মূল অস্ত্র। একটা থাপ্পড় তো হতেই পারে... এমন কথা বাস্তবে অনেকেই শুনে অভ্যস্থ, তবে সেই ট্যাবু ভেঙে এবার সহ্য হোক সমানে সমানে। ফলে বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে এই ছবি অতি-প্রাসঙ্গিক, যেখানে এখনও পর্যন্ত বধূহত্যা, পণ নিয়ে কথা হয় নিত্য দিন। প্রথম থাপ্পড়েই যদি ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়, তবে তা ভবিষ্যত বদলে দিতে।