• ছবি- সড়ক ২
  • পরিচালনা- মহেশ ভাট
  • অভিনেতা- সঞ্জয় দত্ত, আলিয়া ভাট, আদিত্য রায় কাপুর, যীশু সেনগুপ্ত, মাকারাণ্ড দেশপাণ্ডে, প্রিয়ঙ্কা বসু, গুলশন গ্রোভার, অক্ষয় আনন্দ
  • চিত্রনাট্য ও ডায়লগ- পুষ্পদীপ ভরদ্বাজ, মহেশ ভাট, সুহৃতা সেনগুপ্ত
  • ওটিটি প্ল্যাটফর্ম- ডিজনি হটস্টার 

গল্প- সড়ক ২ যে প্রায় তিরিশ বছর আগে মুক্তি পাওয়া সড়ক ছবিটির সিক্যুয়েল সে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। সড়ক ২-এর কাহিনি শুরু হয় আরিয়া নামে এক তরুণীর দুঃসাহসিক অভিযান দিয়ে যেখানে সে জ্ঞানপ্রকাশ নামে এক গুরুর আশ্রমে ঢুকে তাঁর বিশাল ছবিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। দেখা যায় জ্ঞানপ্রকাশের সঙ্গে আরিয়ার একটা সম্পর্কের সুতো বাধা রয়েছে। আগুন লাগানোর পর আরিয়া পালাতে পারে না। তাঁকে ধরে ফেলে জ্ঞানপ্রকাশের লোকজন। জানা যায় আরিয়া আসলে মানসিক ভারসাম্যহীন। এরপরেই কাহিনি-তে প্রবেশ ঘটে রবি কিশোরের।  সড়ক-এর মূল কাহিনি কেন্দ্রভূত হয়েছিল রবি কিশোর এবং পূজার প্রেমকে ঘিরে। দেখা যায় সড়ক ২-এর শুরুতে পূজা-র মৃত্যু হয়েছে এবং রবি তাঁর প্রেমিকার বিয়োগকে মেনে নিতে পারছে না। আর সেই কারণে সে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু, নিজের জীবন নিতে চলা রবি-কে সমানে বাঁচিয়ে চলেছে তাঁর স্বর্গীয় প্রেমিক কাম স্ত্রী পূজা-র আত্মা। এমনই এক মুহূর্তে রবিব কিশোরের কাছে এসে হাজির হয় আরিয়া। জানায়, পূজা-র কাছে সে রবি কিশোরের ট্র্যাভেলস অ্যান্ড ট্যুর  সংস্থা থেকে গাড়ি বুক করেছিল। আত্মহত্যায় উদ্যোগী রবি কিশোর কিছুতেই আরিয়ার সঙ্গে গাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হয় না। আরিয়া এবার পাল্টা রবি কিশোরকে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। শেষমেশ আরিয়ার জেদের কাছে হার মেনে গাড়ি নিয়ে রওনা দেয় রবি কিশোর। রাস্তায় তাঁদের সঙ্গে সফরে সামিল হয় আরিয়ার প্রেমিক বিশাল। গাড়ি এবার সড়কে পড়ে। এরপর ঘটতে থাকে একের পর ঘটনা। দানা বাধতে থাকে কাহিনি। স্পষ্ট হতে থাকে আরিয়ার কাহিনি। আরিয়াকে রক্ষা করাই জীবনের মূলমন্ত্র করে ফেলে রবি কিশোর। সন্তানহীন, পত্নীহীন রবি কিশোরের তখন একটাই জেদ আরিয়াকে শয়তানদের হাত থেকে রক্ষা করা। রবি কিশোর-কে এই অভিযানে সাহায্য করে তাঁর স্বর্গীয় স্ত্রী পূজার আত্মা। ঘটনা পরম্পরায় জড়িয়ে যায় আরিয়ার বাবা-মা-এর কাহিনি। শেষমেশ সড়কের কাহিনি রাস্তাতেই শেষ হয়। 

অভিনয়- রবি কিশোরের ভূমিকায় এখানেও অভিনয় করেছেন সঞ্জয় দত্ত। ১৯৯১ সালে যখন সড়ক মুক্তি পেয়েছিল সে সময় সঞ্জয় ছিলেন সদ্য তিরিশ পার করা এক যুবক। স্বাভাবিকভাবেই সড়ক ২-এর রবি কিশোর এখন প্রৌঢ়। আরিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট। আরিয়ার প্রেমিক বিশাল ওরফে মুন্নার চরিত্রে আদিত্য রায় কাপুর। আরিয়ার বাবা যোগেশ দেশাই-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন যীশু সেনগুপ্ত। আরিয়ার সৎ-মা তথা মাসি নন্দিনীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রিয়ঙ্কা বসু। জ্ঞানপ্রকাশ নামক গুরুর চরিত্রে মাকারাণ্ড দেশপাণ্ডে। জ্ঞানপ্রকাশের মাসলম্যান হাতকাটা দিলীপ-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন গুলশন গ্রোভার। রবি কিশোরের বন্ধু জনির চরিত্রে অক্ষয় আনন্দ বহুদিন বাদে ধরা দিলেন সিনেমার পর্দায়। আর রবি কিশোরের স্ত্রী পূজার ভূমিকায় পূজা ভাট। যদিও, গোটা ছবিতে পূজার বর্তমান সময়ের রক্তমাংসের চেহারাটা সামনে আসেনি। কিছু ফোটো আর পুরনো সড়কের ভিডিও ক্লিপিং এবং একটা হাত ছাড়া বর্তমান সময়ের পূজার চেহারা প্রত্যক্ষ করা যায়নি।  

চিত্রনাট্য- সড়ক-এর কাহিনি আজও সিনেমাপ্রেমীদের ছুঁয়ে যায় কারণ এর চিত্রনাট্য। কিন্তু, চিত্রনাট্যের বুনোনে সড়ক ২ যেন একটা আস্ত ভাগাড়ে। চিত্রনাট্যে এমন কোনও মোচড়-ই নজরে আসেনি, যেখান থেকে মনে হয় সড়ক ২ একটানা বসে দেখা যায়। অভিনেতারা চিত্রনাট্য অনুযায়ী দুরন্ত অভিনয় করেছেন। কিন্তু, আলিয়া-কে বড্ড স্টিরিও টাইপ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে চরিত্রগুলো-র শক্তি দর্শকদের মন ছুঁয়ে যাওয়া কঠিন। সারা ছবি জুড়ে এমন কোনও সংলাপ নেই যা মন ছুঁয়ে যেতে পারে। চিত্রনাট্য বরং যেন বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে ছবির চরম দূর্বল এবং ফাঁকফোকরগুলো। প্রচুর জায়গায় কাহিনির কন্টিনিউয়েশন এমনভাবে ব্রেক করা হয়েছে যা চোখে লাগে। ছবিটি দেখে একবারও মনে হয়নি যে এই ছবিটি ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বসে থেকে দেখা সম্ভব। মহেশ ভাট সত্যি সত্যি কি নিজে চিত্রনাট্যের উপর কাজ করেছিলেন? তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।  

সিনেমাটোগ্রাফি- মহেশ ভাটের ছবিতে তাঁর একটা নিজস্ব ঘরানার সিনেমাটোগ্রাফি দেখতে পাওয়া যায়। বলতে গেলে এই নিয়ে নিজস্ব একটা ঘরানা এবং সিগনেচার টিউন তৈরি করেছেন। তবে সড়ক ২-এর সবখানে যে মহেশের এই সিগনেচার টিউন ছিল তা বলা যায় না। মহেশের সিনেমাটোগ্রাফি মূল কথা হল একটা লম্বা ফ্রেম তারপর মিড ক্লোজ এবং ক্লোজ। আর এর মাঝে মাঝে চরিত্রগুলোকে প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া। মহেশ ভাট এর আগে যত সিনেমা করেছেন তাতে তাঁর একটা কোনও চরিত্র ২ ঘণ্টার সেলুলয়েডে লার্জার দ্যান লাইফ হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, মহেশের কাহিনি এবং তাঁর ক্যামেরার চোখ সবসময়-ই অদৃষ্টবাদের দিশাকে চিহ্নিত করে ছুটে চলে। তাঁর ছবিতে শেক্সপেরিয়ান ট্র্যাজেডির ঘরানা একদম নেই বললেই চলে। বরং মহেশের ঘরানা অনেকটাই মনে করিয়ে দেয় গিরিশ ঘোষ, বিজন ভট্টাচার্য-দের নাটকগুলিকে। সড়ক ২-এর সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে একটা প্রশংসাসূচক বাক্য বেরিয়ে আসা কঠিন।  

পরিচালনা- কী মনে করে সড়ক ২-বানালেন মহেশ ভাট? এই প্রশ্ন যে কোনও সাংবাদিক নিশ্চয় এখন প্রবীণ এই বরেণ্য পরিচালককে করতে চাইবেন। বেশ তো ছিল সড়ক-এর নস্টালজিয়া। এক যৌনপল্লীর বুকে গড়ে ওঠা রবি কিশোর নামে এক ট্যাক্সি চালক ও পূজার প্রেমকাহিনি। আর সেই যৌনপল্লীর মালিক এক বৃহন্নলার চরিত্রে সদাশিবের ঐতিহাসিক অভিনয়। দীপক তিজোরির অসামান্য বন্ধুর চরিত্র- গোতিয়া। বলিউড মশালা ছবিতেও এক কেসস্টাডি হিসাবে থেকে যেতে পারত সড়ক। সেখানে সড়ক ২-এ জুড়ে দেওয়ার কি খুব দরকার ছিল। না চারিদিকে সিক্যুয়েল তৈরির ঢেউ দেখে সড়ককে ফের এই সময়ে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছে জেগেছিল মহেশের। যতদূর শোনা যায় সড়ক ২-এর মেকিং যতটা না মহেশের ইচ্ছেতে হয়েছে তার থেকে বেশি ইচ্ছে ছিল পূজা ভাটের। তাঁর চাপ অনেকটাই ছিল পিতা মহেশের উপরে। কিন্তু, সড়ক ২-কে এভাবে ছন্নছাড়া করে তৈরি করে সড়ক-এর স্মৃতিকে কলঙ্কিত করার দায়টা কী নেবেন পূজা, না মহেশকেই সেই দায় বয়ে বেড়াতে হবে।  

সমালোচনা- এককথায় বলতে গেলে সড়ক ২ ছবিটি একদণ্ড বসেও দেখা যায় না। এতটাই সাদামাটা এবং মোচড়হীন কাহিনি যে দেখা যায় না। মনে হতেই পারে বলিউডে নতুন কোনও যাত্রাপালা চলছে। একে কাহিনির গতি নেই, তারপরে আবার জুড়ে দেওয়া হয়েছে পূজা ভাটের আত্মাকে। ছবিতে দুটো-পক্ষ তৈরি করা হয়েছে একটা ভালো, আর অন্যটা খারাপ। ভালো পক্ষের হিরো আর হিরোইন- সঞ্জয় দত্ত এবং আলিয়া ভাট। আর খারাপ পক্ষের নেতা হল- যীশু সেনগুপ্ত ও মাকারাণ্ড দেশপাণ্ডে। এই দুই পক্ষের সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন আদিত্য রায়কাপুর, অক্ষয় আনন্দ, প্রিয়ঙ্কা বসু, গুলশন গ্রোভাররা। গোটা কাহিনিতে সঞ্জয় দত্তকে দেখে মনে হয়েছে তিনি ঘুড়ির লাটাই। তাঁর লাটাইয়ের সুতো হলেন আলিয়া। যিনি এগিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন কাহিনিকে। আর সঞ্জয় লাটাই-এর মতো সমানে সুতো রূপী আলিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে গিয়েছেন এবং ছবির শেষপ্রান্তে এসে তাঁকে ঘুম পাড়ানি কেক খাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। এরপর নিজেই নেমেছেন দুষ্টের চূড়ান্ত পরিণতি দিতে। যেখানে দুষ্টের নিধনের পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে রবি কিশোর। কলকাতা এবং তার শহরাঞ্চলে এক দুষ্কৃতী হাতকাটা দিলীপ নামে পরিচিত ছিল। কারণ বোমাবাজিতে তার একটা হাত উড়ে গিয়েছিল। সেই থেকে সে হাতকাটা দিলীপ নামে বিখ্যাত হয়। সড়ক ২-এ গুলশন গ্রোভারের একটা হাত কাটা দেখানো হয়েছে। আর তাঁর নামও অনেকটা হাতকাটা দিলীপের মতো- দিলীপ হাতকাটা। তবে, এই চমক সড়ক ২-এর জন্য কোনও প্লাস পয়েন্ট গড়ে তুলতে পারেনি। এই ছবিতে তবে দুটো পাওনা রয়েছে- এক মাকারাণ্ড দেশপাণ্ডে এবং যীশু সেনগুপ্ত। মাকারাণ্ড ভারতীয় চলচ্চিত্রে কতবড় সম্পদ তা ফের তিনি বোঝালেন। দূর্ভাগ্যের বিষয় মহেশের মতো পরিচালকদের সংখ্যা যত কমবে ততই হারিয়ে যাবে মাকারাণ্ডদের প্রতিভা। যীশু সেনগুপ্ত শ্রীচৈতন্যের ভূমিকায় অভিনয় করে বাংলা টেলিভিশনে এক ঐতিহাসিক কাহিনি দুই দশক আগে লিখেছিলেন। কিন্তু, মহাপ্রভু-র চরিত্রের সেই যীশু এরপর যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন। তবে, গত কয়েক বছর ধরে ফের নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেছেন তিনি। বলিউডের বুকে এবার হয়তো তাঁর নামটা পাকাপাকিভাবে লিখে ফেললেন যীশু। বাঙালি শুধুমাত্র আর এক বাঙালির অভিনয় দেখার জন্য সড়ক ২-এর দুঃসাহসিক অভিযানে নেমে যেতে পারে। যদিও, এশিয়ানেট নিউজ বাংলার রেটিং-এর বিচারে সড়ক ২-এক ২-এর বেশি রেটিং দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।