
ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ রথযাত্রার গুরুত্ব একেবারেই আলাদা। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত ভগবান জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রার দর্শন পাওয়ার জন্য পুরীতে আসেন। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে বা অনলাইনে এই যাত্রার সরাসরি সম্প্রচার দেখেন। রথযাত্রা শুধু একটা ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সাম্য, সেবা, ভক্তি এবং ভারতীয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত উদাহরণ। এই যাত্রায় জাতি, ধর্ম, ভাষা বা দেশের ভেদাভেদ মুছে যায় এবং প্রত্যেক মানুষ ভগবানের রথের দড়ি টানার জন্য উদগ্রীব থাকেন।
জগন্নাথ কে?
ভগবান জগন্নাথকে ভগবান বিষ্ণু এবং শ্রীকৃষ্ণের রূপ বলে মনে করা হয়। তাঁর সঙ্গে বড় ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রারও পুজো করা হয়। পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দির ভারতের চার ধামের অন্যতম। বিশ্বাস করা হয়, জীবনে একবার এখানে দর্শন করলে বিশেষ আধ্যাত্মিক ফল লাভ হয়।
রথযাত্রা কেন বের করা হয়?
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান জগন্নাথ বছরে একবার ভাই-বোনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা মন্দিরে যান। গুণ্ডিচা মন্দিরকে ভগবানের মাসির বাড়ি বলে ধরা হয়। এখানে ভগবান প্রায় এক সপ্তাহ থাকেন। এরপর তিনি আবার মন্দিরে ফিরে আসেন। এই ফেরার যাত্রাকে বলা হয় বহুড়া যাত্রা বা উল্টোরথ। এই পুরো উৎসবটাই জগন্নাথ রথযাত্রা নামে পরিচিত।
জগন্নাথ রথযাত্রার শুরু কীভাবে হয়েছিল?
স্কন্দ পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ এবং অন্যান্য বৈষ্ণব গ্রন্থে রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরীতে এই ঐতিহ্য বহু শতক ধরে একটানা চলে আসছে। গজপতি রাজারা এই প্রথাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আজও পুরীর গজপতি মহারাজ রথযাত্রায় একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
জগন্নাথ রথযাত্রায় ৩টি রথের গুরুত্ব কী?
রথযাত্রায় মোট তিনটি বিশাল রথ তৈরি করা হয়।
১. নন্দীঘোষ
এটি ভগবান জগন্নাথের রথ।
উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট।
এতে ১৬টি চাকা থাকে।
লাল ও হলুদ রঙ দিয়ে সাজানো হয়।
২. তালধ্বজ
এটি ভগবান বলভদ্রের রথ।
এতে ১৪টি চাকা থাকে।
সবুজ ও লাল রঙের মিশেলে সাজানো হয়।
৩. দর্পদলন (দেবদলন)
এটি দেবী সুভদ্রার রথ।
এতে ১২টি চাকা থাকে।
কালো ও লাল রঙ দিয়ে সাজানো হয়।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, প্রতি বছর এই তিনটি রথ নতুন করে তৈরি করা হয়। পুরনো রথ আর ব্যবহার করা হয় না।
রথ তৈরির প্রথাও বেশ অদ্ভুত
রথ বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের কাঠ ব্যবহার করা হয়। কাঠ বাছাই করা থেকে শুরু করে রথ তৈরি হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি কাজ নির্দিষ্ট ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলে। শত শত কারিগর দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। নিজের ইচ্ছেমতো একটাও পেরেক বা কাঠ লাগানো যায় না, বরং বহু পুরনো ঐতিহ্য মেনেই সবকিছু করা হয়।
রথযাত্রার আগে 'ছেরা পহরা' প্রথা কেন পালন করা হয়?
রথযাত্রা শুরু হওয়ার আগে পুরীর গজপতি মহারাজ সোনার ঝাড়ু দিয়ে তিনটি রথের পথ পরিষ্কার করেন। এই অনুষ্ঠানকে 'ছেরা পহরা' বলা হয়। এর বার্তা হলো— ভগবানের সামনে রাজা এবং সাধারণ মানুষ সবাই সমান। সেবাই সবচেয়ে বড় ধর্ম।
ভগবান কি সত্যিই অসুস্থ হন?
রথযাত্রার আগে স্নান পূর্ণিমার দিন ভগবানকে ১০৮ কলসি জল দিয়ে স্নান করানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস, এরপর ভগবান অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রায় ১৫ দিন সাধারণ ভক্তদের দর্শন দেন না। এই সময়টাকে 'অনসর কাল' বলা হয়। এরপর ভগবান নতুন রূপে দর্শন দেন, যাকে 'নবযৌবন দর্শন' বলে।
রথের দড়ি টানা এত পুণ্যের কেন?
বিশ্বাস করা হয়, যে ভক্তরা ভগবানের রথের দড়ি টানেন, তাঁরা ভগবানের বিশেষ আশীর্বাদ পান। এই কারণেই লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী দড়ি ধরে রথ টানার চেষ্টা করেন। তবে নিরাপত্তার কারণে প্রশাসন পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে।
ভগবান জগন্নাথের মূর্তি কি অন্যদের থেকে আলাদা?
হ্যাঁ। ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার মূর্তি সাধারণ মন্দিরের মূর্তিগুলোর চেয়ে আলাদা দেখতে। তাঁদের বড় বড় গোল চোখ, অসম্পূর্ণ হাত এবং বিশেষ আকৃতির পিছনে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। এই রূপকে ভগবানের বিরাট এবং সর্বব্যাপী রূপের প্রতীক বলে মনে করা হয়।
ভগবান জগন্নাথের অসম্পূর্ণ মূর্তির গল্পটা কী?
কথিত আছে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি তৈরির জন্য দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে ডেকেছিলেন। বিশ্বকর্মা শর্ত দেন যে, যতক্ষণ কাজ শেষ না হবে, ততক্ষণ কেউ ঘরের দরজা খুলতে পারবে না। কিন্তু অনেকদিন কোনও সাড়া না পেয়ে রাজা দরজা খুলে ফেলেন। সেই মুহূর্তে মূর্তিগুলো সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। এই কারণেই ভগবান জগন্নাথের মূর্তি আজও অসম্পূর্ণ রূপে দেখা যায়।
শুধু পুরী নয়, সারা বিশ্বেই রথযাত্রা হয়
আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা-সহ বিশ্বের বহু দেশে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা বেরোয়। এই ঐতিহ্যকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে ইসকন (ISKCON)-এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।