
পুজোর ছুটি পড়তেই ব্যাগ গোছানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কেউ যাচ্ছেন দিঘা, কেউ পুরুলিয়া, আবার কারও গন্তব্য উত্তরবঙ্গ। নিজের গাড়ি থাকলে বেড়ানোর স্বাধীনতাই আলাদা। কখন থামবেন, কোথায় খাবেন, কোন পথে যাবেন, সবটাই নিজের মতো করে ঠিক করা যায়। কিন্তু সেই স্বাধীনতায় আচমকা ছেদ পড়তে পারে হাইওয়ের একটি টোল প্লাজায়। ধরা যাক, পরিবারের সবাইকে নিয়ে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। গাড়িতে জ্বালানি ভরা, গুগল ম্যাপে রাস্তা ঠিক করা, হোটেলের বুকিংও সম্পূর্ণ। প্রথম টোল প্লাজায় পৌঁছতেই দেখা গেল FASTag থেকে টাকা কাটা যাচ্ছে না। পিছনে গাড়ির লম্বা লাইন, সামনে টোলকর্মীর নির্দেশ, আর গাড়ির ভিতরে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যরা। কয়েক মিনিটের এই অস্বস্তি কখন যে দীর্ঘ অপেক্ষায় পরিণত হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। অথচ সফরের আগে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করে নিলেই এমন পরিস্থিতির ঝুঁকি অনেকটা কমানো যায়। FASTag এখন জাতীয় সড়কে যাতায়াতের পরিচিত ব্যবস্থা। কিন্তু এটি কীভাবে কাজ করে, কখন সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং কোন সুবিধা আপনার কাজে লাগবে, তা জানা আছে কি?
গাড়ি তৈরি, কিন্তু FASTag প্রস্তুত তো?
গাড়ির সামনের কাচে লাগানো ছোট্ট ট্যাগটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে টোল দেওয়ার ব্যবস্থা। RFID প্রযুক্তির সাহায্যে টোল প্লাজার নির্দিষ্ট লেনে থাকা যন্ত্র গাড়ির FASTag শনাক্ত করে। তার পরে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে টোলের টাকা কেটে নেওয়া হয়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নগদ টাকা দেওয়ার জন্য আলাদা করে দাঁড়াতে হয় না। তবে ট্যাগ লাগানো থাকাই যথেষ্ট নয়। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলে, সেটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে অথবা ট্যাগ শনাক্ত করতে সমস্যা হলে পেমেন্ট আটকে যেতে পারে। তাই রওনা হওয়ার আগের দিনই নিজের FASTag-এর ব্যালান্স এবং অ্যাকাউন্টের অবস্থা পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। দূরের পথে একাধিক টোল প্লাজা পড়লে সম্ভাব্য খরচের কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় টাকা রাখুন। রিচার্জ করেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন না। লেনদেন সম্পূর্ণ হয়েছে কি না, ব্যালান্স আপডেট হয়েছে কি না, সেটিও দেখে নিন। যে ব্যাঙ্ক বা অনুমোদিত সংস্থা থেকে FASTag নিয়েছেন, তাদের অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটে এই তথ্য যাচাই করা যায়।
গাড়ির নম্বরের সঙ্গে তথ্যের গরমিল হলে?
অনেকেই পুরনো গাড়ি বিক্রি করেন, নতুন গাড়ি কেনেন অথবা কোনও কারণে FASTag পরিবর্তন করেন। এই সময় পুরনো ট্যাগের বিষয়টি উপেক্ষা করলে পরে জটিলতা তৈরি হতে পারে। FASTag একটি নির্দিষ্ট গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তথ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই গাড়ির মালিকানা বদল হলে পুরনো ট্যাগের অ্যাকাউন্ট কীভাবে বন্ধ করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত। এখানে আরও একটি পরিবর্তনের কথা মনে রাখা প্রয়োজন। NHAI-এর ঘোষণা অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে নতুন করে ইস্যু করা ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ ও ভ্যানের FASTag-এর ক্ষেত্রে নিয়মিত ইস্যু-পরবর্তী KYV বা ‘Know Your Vehicle’ যাচাই বন্ধ করা হয়েছে। আগে থেকে ইস্যু হওয়া এই শ্রেণির ট্যাগের ক্ষেত্রেও নিয়মিত KYV বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভুল তথ্য, ট্যাগের অবস্থান বা অপব্যবহার নিয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে যাচাই হতে পারে। ট্যাগ ইস্যুর আগে গাড়ির তথ্য যাচাইয়ের নিয়ম অবশ্যই বহাল রয়েছে। একই গাড়ির জন্য একাধিক সক্রিয় FASTag রাখার বিষয়টিও এড়িয়ে চলা দরকার। NHAI-এর ‘One Vehicle, One FASTag’ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হল প্রতিটি গাড়ির জন্য একটি কার্যকর FASTag ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করা। আপনার কাছে পুরনো ও নতুন, দু'টি ট্যাগ থাকলে কোনটি চালু থাকবে এবং অন্যটি কীভাবে বন্ধ করতে হবে, তা ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করুন।
টোল প্লাজায় পেমেন্ট আটকে গেলে মাথা ঠান্ডা রাখুন:
যাত্রাপথে FASTag কাজ না করলেই যে ট্যাগটি নষ্ট হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কখনও ব্যালান্সের সমস্যা, কখনও অ্যাকাউন্টের বিধিনিষেধ, আবার কখনও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে পেমেন্ট ব্যর্থ হতে পারে। প্রথমে টোলকর্মীদের নির্দেশ শুনুন। অনুমোদিত বিকল্প পেমেন্টের ব্যবস্থা থাকলে সে সম্পর্কে জানতে পারেন। একই সঙ্গে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটা হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন। টাকা কেটে গেলেও পেমেন্ট নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে লেনদেনের বিবরণ সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সমস্যা বারবার হলে ট্যাগ পরীক্ষা করান। শুধু একটি টোল প্লাজায় পেমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে বলে তড়িঘড়ি নতুন FASTag কেনার প্রয়োজন নেই। আগে সমস্যার কারণ জানা জরুরি।
বছরে বারবার হাইওয়েতে যান? হিসাব করে দেখুন বার্ষিক পাস:
FASTag-এর সঙ্গে যুক্ত বার্ষিক পাসের সুবিধা নিয়মিত গাড়ি ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা করে বিবেচনা করার মতো। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে যোগ্য ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ ও ভ্যানের FASTag Annual Pass-এর মূল্য ৩,০৭৫ টাকা। এই পাসের মেয়াদ এক বছর অথবা ২০০টি টোল প্লাজা পারাপার পর্যন্ত, যেটি আগে হবে। তবে সব রাস্তায় এই সুবিধা মিলবে না। নির্দিষ্ট জাতীয় সড়ক ও জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজায় এটি কার্যকর। অন্য কিছু টোল প্লাজায় সাধারণ FASTag ব্যালান্স থেকেই টাকা কাটা হতে পারে। ধরা যাক, আপনার গাড়ি নিয়ে সারা বছরে একাধিকবার দীর্ঘ সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য টোল খরচের সঙ্গে পাসের মূল্য তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কিন্তু বছরে এক-দু'বার বেড়াতে বেরোনোর জন্য পাস কিনলেই যে সাশ্রয় হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কোথায় যাতায়াত করবেন এবং কতবার টোল পার হবেন, সেটিই এখানে মূল হিসাব। যোগ্যতা ও সুবিধার বিস্তারিত জানতে রাজমার্গযাত্রা (Rajmargyatra) অ্যাপ অথবা NHAI-এর সরকারি ওয়েবসাইট দেখুন।
টোলের টাকা কাটছে, অথচ আপনি জানেনই না?
ভ্রমণের ব্যস্ততায় অনেকেই FASTag-এর লেনদেনের হিসাব নিয়মিত দেখেন না। কিন্তু অচেনা লেনদেন বা একই ধরনের একাধিক চার্জ চোখে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাই সফর শেষে কিংবা দীর্ঘ যাত্রার মাঝেও সুযোগ পেলে লেনদেনের ইতিহাস পরীক্ষা করুন। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। FASTag বন্ধ হয়ে যাবে বা অ্যাকাউন্টে সমস্যা রয়েছে বলে কোনও অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজ এলে তাতে দেওয়া লিঙ্কে তাড়াহুড়ো করে ক্লিক করবেন না। রিচার্জের জন্য ব্যাঙ্ক বা অনুমোদিত পরিষেবা ব্যবহার করুন। কাউকে OTP, UPI PIN কিংবা ব্যাঙ্কের পাসওয়ার্ড দেবেন না। সন্দেহজনক লেনদেন হলে রেফারেন্স নম্বর রেখে ব্যাঙ্কে অভিযোগ জানান।
সফরের আগে কয়েক মিনিট, পথে বাঁচতে পারে অনেকটা সময়:
পুজোর রোড ট্রিপে রাস্তার যানজট, আবহাওয়া কিংবা গাড়ির যান্ত্রিক সমস্যা সব সময় এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু FASTag নিয়ে অসতর্কতার কারণে তৈরি হওয়া ঝামেলা অনেক ক্ষেত্রেই আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে এড়ানো যায়। তাই গাড়ির চাবি হাতে নেওয়ার আগে একবার ব্যালান্স দেখুন, অ্যাকাউন্ট সচল আছে কি না নিশ্চিত করুন, গাড়ির তথ্য মিলিয়ে নিন এবং প্রয়োজনে বার্ষিক পাসের সুবিধা যাচাই করুন। পথে টোল সংক্রান্ত সাহায্যের প্রয়োজন হলে জাতীয় হাইওয়ে হেল্পলাইন ১০৩৩-এ যোগাযোগ করা যায়। বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ শুরু হোক বাড়ি থেকেই। টোল প্লাজায় পৌঁছে যেন প্রথমবার মনে না পড়ে, FASTag-এর খোঁজ নেওয়াটাও যাত্রার প্রস্তুতিরই একটি অংশ।