
তেলের দাম রোজ বাড়ছে। তার উপর পলিউশন, সার্ভিসিংয়ের খরচ। সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের এখন নজর বৈদ্যুতিন স্কুটারে। OLA, Ather, TVS, Bajaj, সব কোম্পানির শোরুমে ভিড়। লুকে মাখন, পিকআপে পেট্রোল স্কুটারকে হার মানায়, আর খরচ? প্রতি কিমিতে মাত্র ১৫-২০ পয়সা।
কিন্তু শুধু ‘০ থেকে ৪০ কিমি ৩ সেকেন্ডে’ শুনেই বুক করবেন না। লাখ টাকার জিনিস। ৫ বছর চালাবেন। তাই শোরুমে যাওয়ার আগে এই ৫টা পয়েন্ট মাথায় গেঁথে নিন।
১. রেঞ্জ: এক চার্জে কত কিমি? ARAI না রিয়েল ওয়ার্ল্ড? কোম্পানি বলবে ‘এক চার্জে ১৫০ কিমি’। এটা ARAI সার্টিফায়েড রেঞ্জ। ল্যাবে ৩০ কিমি স্পিডে, একা, বিনা ব্রেকে টেস্ট হয়। বাস্তবে কলকাতার জ্যাম, সিগন্যাল, পিলিয়ন নিয়ে চালালে ১৫০ কিমির রেঞ্জ নেমে আসবে ১০০-১১০ কিমিতে।
কী করবেন: আপনার ডেইলি রান কত? অফিস-বাড়ি মিলিয়ে ৪০ কিমি হলে মিনিমাম ৮০-১০০ কিমি রিয়েল রেঞ্জের স্কুটার নিন। কারণ রোজ ১০০% চার্জ করা ব্যাটারির জন্য খারাপ। ২০% থেকে ৮০% এর মধ্যে রাখাই নিয়ম। তাই রেঞ্জের ৩০% বাফার রাখুন। Ather, OLA অ্যাপে ‘TrueRange’ দেখায়। সেটা মেলান।
২. ব্যাটারি: LFP না NMC? ওয়ারেন্টি কত বছর? চার্জিং স্পিড কত? ই-স্কুটারের হার্ট হল ব্যাটারি। দামের ৪০% এটাই। দুটো টাইপ হয়। NMC ব্যাটারি হালকা, পাওয়ার বেশি, কিন্তু গরমে আগুন ধরার রিস্ক বেশি। LFP ব্যাটারি একটু ভারী, রেঞ্জ কম, কিন্তু লাইফ বেশি আর সেফ। ভারতের গরমে LFP ভালো।
কী করবেন: মিনিমাম ৩ বছর বা ৩০,০০০ কিমির ব্যাটারি ওয়ারেন্টি চাই। Ather, TVS ৫ বছর দেয়। চেক করুন ব্যাটারি AIS-156 ফেজ-২ সার্টিফায়েড কি না। এটা আগুন লাগার নতুন সেফটি নর্ম।
ফাস্ট চার্জিং: বাড়িতে ০-১০০% হতে ৫-৬ ঘণ্টা লাগেই। কিন্তু শোরুমে জিজ্ঞেস করুন ফাস্ট চার্জার সাপোর্ট আছে কি না। OLA S1 Pro, Ather 450X এ ১ ঘণ্টায় ৮০% চার্জ হয়। লং রাইডে এটা গেম চেঞ্জার।
৩. মোটর পাওয়ার ও টপ স্পিড: কাগজে না রাস্তায়? শোরুম বলবে ‘টপ স্পিড ১১৬ কিমি’। কিন্তু দেখুন মোটর পাওয়ার কত। ২৫০W মোটর হলে RTO রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স লাগে না। কিন্তু ওটা সাইকেলের মতো। ফ্লাইওভারে উঠবে না।
কী করবেন: শহরের জন্য মিনিমাম ৩ kW পিক পাওয়ার আর ১৫০০W রেটেড পাওয়ার দরকার। এতে দুজন নিয়ে সহজে ৬০-৭০ কিমি স্পিড উঠবে। পাহাড়ি রাস্তা বা ফ্লাইওভারের জন্য ‘হিল হোল্ড’ ফিচার মাস্ট। Ather, TVS iQube এ আছে।
৪. ব্রেকিং ও সেফটি: ডিস্ক ব্রেক আছে, কিন্তু CBS না ABS? স্পিড তো তুললেন, থামবেন কীভাবে? বেশিরভাগ ই-স্কুটারে সামনে ডিস্ক, পিছনে ড্রাম ব্রেক দেয়। এটা চলবে। কিন্তু দেখুন CBS না কি ABS।
CBS মানে কম্বাইন্ড ব্রেকিং সিস্টেম। একটা ব্রেক চাপলে দুটো চাকাই ধরবে। ১২৫cc এর নিচে এটা সরকারি নিয়ম। ABS এখনও দামী ই-স্কুটারে আসে না।
কী করবেন: সামনে-পিছনে দুটোই ডিস্ক ব্রেক আর CBS হলে বেস্ট। রিজেনারেটিভ ব্রেকিং আছে কি না দেখুন। থ্রটল ছাড়লেই স্কুটার নিজে ব্রেক মেরে ব্যাটারি চার্জ করে। রেঞ্জ ৭-১০% বাড়ে। IP67 রেটিং মাস্ট। মানে জলে ডুবে গেলেও ব্যাটারি-মোটর শর্ট হবে না। কলকাতার বৃষ্টিতে এটা লাইফ সেভার।
৫. আফটার সেলস সার্ভিস, সাবসিডি ও রিসেল ভ্যালু: ই-স্কুটার মানে শুধু হার্ডওয়্যার না, সফটওয়্যারও। OTA আপডেট, অ্যাপ কানেক্টিভিটি লাগে। সার্ভিস সেন্টার আপনার বাড়ি থেকে কত দূরে? স্পেয়ার পার্টস অ্যাভেলেবল? OLA-র সার্ভিস নিয়ে কমপ্লেন আছে, Ather-TV S এর নেটওয়ার্ক ভালো।
কী করবেন: FAME II সাবসিডি চেক করুন। প্রতি kWh এ ১০,০০০ টাকা ছাড়। ৩ kWh ব্যাটারি হলে ৩০,০০০ টাকা কম। কিন্তু এটা শুধু কয়েকটা মডেলে। ডিলারকে জিজ্ঞেস করুন অন-রোড প্রাইস সাবসিডি ধরে বলছে কি না।
রিসেল ভ্যালু এখনও পেট্রোলের মতো না। ৩ বছর পর ব্যাটারি হেলথ ৮০% এর নিচে নামলে দাম পড়ে যায়। তাই এক্সটেন্ডেড ওয়ারেন্টি নিন।
শেষ কথা: স্টাইল, কালার, টাচস্ক্রিন দেখে গলবেন না। রেঞ্জ, ব্যাটারি সেফটি, মোটর পাওয়ার, ব্রেকিং, সার্ভিস, এই ৫টা পিলার ঠিক থাকলে আপনার সাধের ই-স্কুটার ৭-৮ বছর হাসতে হাসতে চলবে। টেস্ট রাইড মাস্ট। ডবল ক্যারি করে ফ্লাইওভারে উঠে দেখুন দম আছে কি না।