
বাঙালি কন্যা অনুপর্ণা রায়ের মুকুটে ফের নয়া পালক। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ফের পুরস্কার জিতে নজর কাড়লেন পুরুলিয়ার নিতুড়িয়ার মেয়ে। তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’-এর ঝুলিতে এল সম্মানজনক NETPAC Award। এশিয়ার ছবিগুলির মধ্যে সেরা ছবিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
মুম্বইয়ের রাতের জীবন, শহরের অন্ধকার অলিগলি, সম্পর্কের টানাপড়েন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’। ছবিটির বিশেষত্ব, এটি বহুভাষিক। হিন্দি, মারাঠি এবং বাংলা—তিন ভাষার ব্যবহার রয়েছে ছবিতে। অভিনয় করেছেন নীলিমা শর্মা, কাজল কেশব, প্রীতম পিলানিয়া এবং যতীন সারিন। শহুরে জীবনের আড়ালে থাকা মানুষের চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন এবং লড়াইও উঠে এসেছে এই ছবিতে।
তবে ভেনিসে অনুপর্ণার সাফল্য এই প্রথম নয়। এর আগেও তাঁর ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁর প্রথম দিকের ছবি ‘সংগস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিল। ‘অরিজন্তি’ বিভাগে ছবিটি সম্মান পাওয়ার পর সাদা-লাল পাড় শাড়ি পরে ফরাসি পরিচালক জুলিয়া দুকুরনোর হাত থেকে পুরস্কার নেন অনুপর্ণা। সেই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাঙালি পরিচালকের সাফল্য নতুন করে নজর কেড়েছিল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও দেশে ছবিটি নিয়ে তৈরি হয়েছে অন্য জটিলতা। পরিচালকের দাবি, সেন্সর বোর্ড ছবিটিকে ছাড়পত্র দিতে রাজি হয়নি। ছবিটি সমাজের জন্য ভালো নয়—এমন আপত্তি জানিয়ে মুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়নি বলেই জানিয়েছেন অনুপর্ণা।
‘সংগস অফ ফরগটেন ট্রিজ’-এর গল্পও মুম্বই শহরে বসবাসকারী দুই মহিলাকে ঘিরে। ছবিতে অভিনয় করেছেন নাজ শেখ এবং সুমি বাঘেল। ছবিটির প্রযোজক বিভাংশু রায়, রোমিল মোদি এবং রঞ্জন সিং। ছবিটি প্রেজেন্ট করেছেন অনুরাগ কাশ্যপ।
অনুপর্ণার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে একেবারে অন্যরকম জীবনকাহিনি। পুরুলিয়ার নিতুড়িয়ার সরবড়ির কাছে নারায়ণপুরের একসময়ের বাসিন্দা তিনি। এলাকার মানুষের কাছে আজও তিনি ‘মাম্পি’ নামেই পরিচিত। পড়াশোনা করেছেন নিতুড়িয়ার রানিপুর হাইস্কুলে।
মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন না পাওয়ায় বাবা-মা তাঁকে ইংরেজির শিক্ষক মামা নীলোৎপল সিংহের কাছে পাঠিয়ে দেন। আর সেই সিদ্ধান্তই যেন বদলে দেয় কিশোরী অনুপর্ণার জীবন। মামার হাত ধরে ইংরেজি সাহিত্য, ভারতীয় সংস্কৃতি এবং জীবনকে দেখার এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হন তিনি।
পরে গতানুগতিক কর্মজীবনের পথে না হেঁটে দু’টি নামী কর্পোরেট সংস্থার চাকরি ছেড়ে দেন অনুপর্ণা। বেছে নেন সিনেমা তৈরির পথ। সেই সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে তাঁকে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চে।
মামার বাড়িতে থেকেই উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা করেছিলেন অনুপর্ণা। পুরুলিয়ার পুঞ্চার ন’পাড়া গ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাই অত্যন্ত গভীর। ২০২১ সালে সেই গ্রামের বিভিন্ন ল্যান্ডস্কেপে শুরু হয় তাঁর প্রথম সিনেমার শুটিং। গ্রামবাংলার পরিবেশ, প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর চলচ্চিত্রের ভাবনাতেও প্রভাব ফেলেছে।
২০২৩ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ছবি ‘রান টু দ্য রিভার’। এরপর ‘সংগস অফ ফরগেটেন ট্রিজ’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলে পরিচিতি পান তিনি। আর এবার ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’-এর হাত ধরে ফের ভেনিসে পুরস্কার জয়।
শেষবার ২০২৩ সালের কালীপুজোর সময় পুঞ্চার ন’পাড়ায় মামার বাড়িতে গিয়েছিলেন অনুপর্ণা। ছোট শহর, গ্রামের স্মৃতি এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক সিনেমার মঞ্চ—অনুপর্ণা রায়ের এই যাত্রাপথ তাই নিছক সাফল্যের গল্প নয়, বরং নিজের স্বপ্নের পিছনে ছুটে চলার এক অনুপ্রেরণার কাহিনি।
Entertainment News ( বাংলা বিনোদনের খবর ): Read Entertainment News including movie reviews, Trailers, Celebrity gossips, TV shows and other Entertainment News in at Asianet News Bangla.