
নেপালের গোর্খা জেলায় বুড়ি গণ্ডকী নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। সেখানে উদ্ধারকাজ চালিয়ে এখনও পর্যন্ত ৩৬ জনকে নিরাপদে সরিয়ে এনেছে নেপাল সেনা। সেনার তরফ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধার হওয়া মানুষদের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
এদিকে, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA) জানিয়েছে, রবিবার সকালে গোর্খা জেলার লোকপা ও ছুমলিংয়ের মাঝে বিশাল ভূমিধসের কারণে বুড়ি গণ্ডকী নদীর গতিপথ আটকে যায়। এর জেরে কাদা ও পাথর মেশানো জলের তোড়ে ভেসে যায় বহু বাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। এই ঘটনায় এখনও অন্তত পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ পাঁচজনের মধ্যে দুজন মহিলা ও তিনজন পুরুষ। বিপর্যয়ের সময় তাঁরা চুমোত্নুব্রি রুরাল মিউনিসিপ্যালিটি-৬ এর উজ্জিলুদ এলাকায় একটি ভেড়ার খামারে ছিলেন।
বুড়ি গণ্ডকী নদীর দু'কূল ছাপিয়ে এই বন্যা আছড়ে পড়ে একাধিক জনবসতিতে। গোটা এলাকার পরিবহণ ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। গোর্খার আরুঘাট থেকে ধাদিং যাওয়ার কংক্রিটের ব্রিজের একটা বড় অংশ জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে।
ন্যাচেতাত থেকে সিরদিবাস যাওয়ার ঝুলন্ত ব্রিজ এবং মাছিখোলা-কেরাউজা ফুটব্রিজ-সহ একাধিক ঝুলন্ত সেতু ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি সোতিমায় একটি লোহার কংক্রিটের ব্রিজও ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বিদ্যুৎ ও শিল্পক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ৩৮১ মেগাওয়াটের বুড়ি গণ্ডকী প্রজেক্টের মূল ক্যাম্প এলাকা ও যন্ত্রপাতি বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে। এছাড়া দুটি টেলিফোন টাওয়ার এবং ৫০টি বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোয়ার মাছিখোলা এলাকা জলে ডুবে যাওয়ায় ২০ থেকে ২২টি বাড়ি চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দুর্গত এলাকায় ৪৩৭ জন নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করেছে এনডিআরআরএমএ (NDRRMA)। এর মধ্যে নেপাল সেনা, নেপাল পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী রয়েছে। তল্লাশি ও উদ্ধারকাজের জন্য নেপাল সেনার চারটি হেলিকপ্টার নামানো হয়েছে। তারা ইতিমধ্যেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ৪৭ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে।
ভূমিধসের কারণ খতিয়ে দেখতে ভূতত্ত্ববিদ ও ড্রোন-সহ একটি বিশেষ দল পাঠিয়েছে প্রশাসন। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে বেইলি ব্রিজ তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়েও সমীক্ষা চালাচ্ছেন আধিকারিকরা। বুড়ি গণ্ডকী নদীর তীরের বাসিন্দাদের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর। তাঁদের নদীখাত থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ বা রাস্তা এড়িয়ে চলতে এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বলা হয়েছে।
এই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ জানিয়েছেন, আকাশ ও স্থলপথে তল্লাশি এবং উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য নেপাল সেনার একটি দল মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বুড়ি গণ্ডকী সংলগ্ন বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ ও লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজে সাহায্য করতে হেলিকপ্টার নামানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাঠমান্ডু থেকে একটি জয়েন্ট র্যাপিড রেসপন্স টিমকেও এয়ারলিফ্ট করে ওই এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
এর এক ঘণ্টা পর নেপাল সেনা জানায়, রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওই বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ছ'জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রবিবার সকালে গোর্খায় বুড়ি গণ্ডকী নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় নেপালে ফের ভয়াবহ বন্যার সতর্কতা জারি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। তিনি জানান, ঘটনার পরপরই হেলিকপ্টার নামানো হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালাতে এবং মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে কাজে লাগানো হয়েছে।
সিরদিবাস, জগত, সলেরি, খোরলাবেসি, মাছিখোলা, সোতি, আরখেত এবং আরুঘাটের বাসিন্দাদের, বিশেষ করে যাঁরা বুড়ি গণ্ডকী নদীর তীরে থাকেন, তাঁদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার এবং চরম সতর্ক থাকার আবেদন জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।