
মঙ্গলবার সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের বেশ কয়েকটি শহরে সতর্কতা জারি করেছিল দেশটির সিভিল ডিফেন্স। সতর্কতার আওতায় ছিল পবিত্র মক্কা নগরী, জেদ্দা ও তায়েফ। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ইতিহাসে এই প্রথম মক্কায় আকাশপথে হামলার আশঙ্কায় এমন সতর্কতা জারি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-সমর্থিত হুথিদের একাধিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই এই নজিরবিহীন সতর্কতা জারি করা হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে।
ইজরায়েলি সংবাদপত্র ‘হায়োম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মদিনার প্রিন্স মহম্মদ বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও (MED) সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, এর আগে সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার এবং সৌদি বাহিনী ইয়েমেনের তায়েজ শহরের কাছে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল। ইয়েমেন থেকে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে হুথিদের হামলায় সৌদি আরবে ১৩ জন আহত হওয়ার পরের দিনই এই সতর্কতা জারি করা হয়।
সৌদি সিভিল ডিফেন্স ‘এক্স’-এ এক পোস্টে জানায়, মক্কা শহরে বিপদ কেটে গিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে সিভিল ডিফেন্সের নির্দেশিকা মেনে চলার পাশাপাশি ভিড় না করার এবং হামলার দৃশ্য ভিডিও না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। জরুরি প্রয়োজনে ৯১১ নম্বরে ফোন করতেও বলা হয়। এর আগে সৌদি সিভিল ডিফেন্স দেশের ছয়টি অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করেছিল।
মক্কার দিকে ধেয়ে আসা একটি ড্রোন ধ্বংস করার বিষয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা। হুথিদের পলিটব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ ‘এক্স’-এ দাবি করেন, মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ পুরনো ও অসার মিথ্যা। তাঁর বক্তব্য, এর আগেও একই ধরনের দাবি করা হয়েছিল এবং এবারও তা কাউকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথিরা বলে দাবি করা হয়েছে। ওই হামলায় তেলের পাইপলাইনে আগুন ধরে যায় এবং ৭৩ জন আহত হন। অন্যদিকে, সোমবার পশ্চিম ইয়েমেনে হুথিদের হামলায় সরকারি বাহিনীর আটজন সেনা নিহত হয়েছেন বলে দুটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে। একইসঙ্গে দক্ষিণ সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ‘ডজন ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন’ দিয়ে হামলা চালানোর দাবিও করেছে হুথিরা।
জুলাইয়ে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার পর থেকেই সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। রিয়াদের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার পাশাপাশি লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগও রয়েছে হুথিদের বিরুদ্ধে। এর জেরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
হাজেম আল-আসাদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইয়েমেনের মানুষের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের ‘আগ্রাসন’ অব্যাহত থাকলে হুথিদের পাল্টা পদক্ষেপও চলবে এবং তা আরও জোরদার করা হবে।
এদিকে, বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে মঙ্গলবার সতর্ক করেছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ইব্রাহিম আল-হাশমি বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে তা ‘পুরো বিশ্বের জন্য বিপর্যয়কর’ হয়ে উঠবে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী বাব আল-মান্দাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার জন্য সৌদি যুবরাজের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, শনিবার হুথিরা ওয়াশিংটনে ফোন করে যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সব মিলিয়ে, লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে ঘিরে হুথিদের তৎপরতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত ক্রমেই বড় আকার নিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি নেতৃত্বের হাতে থাকা বিকল্পও ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। ফলে হুথিদের মোকাবিলায় রিয়াদ পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই নজরে।