
বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে এবার বড় পরিবর্তনের পথে রাষ্ট্রপুঞ্জ। শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদ এমন একটি নতুন বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, যেখানে মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলক চিত্র আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা হবে। নতুন মানচিত্রে আফ্রিকাকে তুলনামূলকভাবে অনেক বড় এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে ছোট দেখাবে। টোগোর নেতৃত্বে এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে আনা প্রস্তাবটি ১৬৪-১ ভোটে পাস হয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। একমাত্র দেশ হিসেবে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে আমেরিকা।
ওয়াশিংটন অবশ্য এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছে। মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচের দাবি, রাষ্ট্রপুঞ্জের উচিত প্রকৃত বৈশ্বিক সমস্যাগুলিতে মনোযোগ দেওয়া, ১৬ শতকের একটি মানচিত্র নিয়ে বিতর্কে নয়। তাঁর অভিযোগ, এই ধরনের উদ্যোগ রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করছে এবং এর পিছনে একটি ‘আদর্শগত এজেন্ডা’ রয়েছে। অন্যদিকে আফ্রিকান ইউনিয়ন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, আরও নির্ভুল ও ন্যায্যভাবে বিশ্বের ভৌগোলিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’।
রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রস্তাবে Equal Earth projection ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ এই প্রজেকশন তৈরি করেন। Equal Earth হল একটি ‘equal-area projection’। অর্থাৎ, এতে বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের আয়তন তাদের প্রকৃত ভৌগোলিক আয়তনের অনুপাতে দেখানো হয়। ফলে আফ্রিকাকে প্রচলিত মানচিত্রের তুলনায় অনেক বড় দেখায়, আর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে তুলনামূলকভাবে ছোট দেখায়। লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ওশেনিয়াও আপেক্ষিকভাবে বেশি জায়গা পায়।
তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়। এর ফলে Mercator projection নিষিদ্ধ হচ্ছে না। কোনও দেশ, স্কুল, প্রকাশনা সংস্থা বা প্রযুক্তি সংস্থাকেও নতুন মানচিত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়নি। শিক্ষা, জনসচেতনতা এবং যেখানে দেশ বা মহাদেশের প্রকৃত আয়তনের তুলনা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে Equal Earth ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত Mercator projection তৈরি করেছিলেন ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর। ১৫৬৯ সালে তৈরি এই মানচিত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে নৌ-চলাচল সহজ করা। এতে দিক ও কোণ যথাযথভাবে ধরে রাখা যায়, ফলে নাবিকদের পথ নির্ধারণে সুবিধা হত। কিন্তু পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল মানচিত্রে দেখাতে গেলে কিছুটা বিকৃতি অনিবার্য। Mercator projection-এ বিষুবরেখা থেকে যত মেরুর দিকে যাওয়া হয়, স্থলভাগের আকার তত বেশি বড় হয়ে দেখা যায়। এর ফলে উত্তর গোলার্ধের দেশ ও অঞ্চলগুলি বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। অন্যদিকে আফ্রিকার মতো বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চল তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকা। অনেক Mercator মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান আকারের মনে হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়। তবে Mercator মানচিত্রকে ভৌগোলিকভাবে ‘ভুল’ বলা হচ্ছে না। নৌ-চলাচলের সুবিধার জন্যই এর এই ধরনের বিকৃতি তৈরি করা হয়েছিল। বিতর্কের মূল বিষয় হল, নেভিগেশনের বাইরে স্কুল, অফিস ও জনসাধারণের ব্যবহারে এই মানচিত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় মানুষ মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তন সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারে।
এই প্রচারের নেতৃত্ব দিয়েছে টোগো। তাদের সঙ্গে রয়েছে আফ্রিকার অন্যান্য দেশ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন। ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের অ্যাসেম্বলি ‘Correct the Map’ প্রচারাভিযানকে সমর্থন করে। এরপর বিষয়টি রাষ্ট্রপুঞ্জে তোলা হয়। আফ্রিকান ইউনিয়নের বক্তব্য, বহু বছর ধরে Mercator projection-এর কারণে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন ছোট করে দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড় হলেও প্রচলিত মানচিত্রে দুই অঞ্চলকে প্রায় সমান আকারের মনে হয়। টোগোর বিদেশমন্ত্রী রবার্ট ডুসে বলেন, মানচিত্র শিক্ষা ও মানুষের সম্মিলিত ধারণাকে প্রভাবিত করে। তাঁর কথায়, “ন্যায্য পৃথিবীর শুরু একটি ন্যায্য মানচিত্র দিয়ে।” আফ্রিকার প্রচারকারীদের মতে, বিষয়টি শুধু মানচিত্র তৈরির প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয়। মানচিত্র বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল সম্পর্কে মানুষের গুরুত্ব ও প্রভাবের ধারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে। টোগো এই উদ্যোগকে ঔপনিবেশিক যুগের উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করেছে। তবে তাদের দাবি, এটি ইউরোপ বা অন্য কোনও সভ্যতার বিরুদ্ধে প্রচার নয়।
না। সাধারণ পরিষদের এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এর ফলে Mercator projection নিষিদ্ধ হচ্ছে না। কোনও দেশ, স্কুল, প্রকাশক বা প্রযুক্তি সংস্থাকে তাদের মানচিত্র পরিবর্তনের নির্দেশও দেওয়া হয়নি। বরং শিক্ষা, জনসাধারণের যোগাযোগ এবং যেখানে বিভিন্ন দেশের বা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনা করা প্রয়োজন, সেখানে Equal Earth বা অন্যান্য equal-area projection ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সমুদ্র ও আকাশপথে নেভিগেশনের ক্ষেত্রেও Mercator projection বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়নি। কারণ দিক নির্দেশনা সঠিকভাবে ধরে রাখার ক্ষেত্রে এখনও এই প্রজেকশনের ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে।
টোগো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে তাদের স্কুলের ভূগোলের পাঠ্যসামগ্রী থেকে Mercator projection সরিয়ে Equal Earth ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য সরকার, স্কুল, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রযুক্তি সংস্থাকেও Equal Earth ব্যবহারে উৎসাহিত করবে তারা। আগামী ছয় মাস আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য দেশ এবং অন্যান্য অঞ্চলের সমর্থকদের সঙ্গে আলোচনা করে বৃহত্তর পরিসরে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের কৌশল তৈরি করা হবে। ফ্রান্সও এই প্রস্তাবের সহ-উদ্যোক্তা ছিল এবং তারা Mercator projection পরিত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছে। ফরাসি বিদেশমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, প্রচলিত মানচিত্রে আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনকে তাদের প্রকৃত আয়তনের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয় এবং গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান মনে হয়। তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের এই ভোটের পর রাতারাতি পৃথিবীর সব মানচিত্র বদলে যাবে না। স্কুল, প্রকাশনা সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল ম্যাপিং প্ল্যাটফর্মগুলি স্বেচ্ছায় কোন প্রজেকশন ব্যবহার করবে, তার উপরই এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে।