নীল ষষ্ঠী: নীল ষষ্ঠীর দিনে কার পূজা হয়! কেনই বা সন্তানের মঙ্গল কামনা করতে হয় এই দিন? জেনে নিন সমস্ত তাৎপর্য

Published : Apr 11, 2026, 03:46 PM IST
Lord Shiva

সংক্ষিপ্ত

নীল ষষ্ঠী বাংলার এক ভিন্নধর্মী ব্রত, যেখানে সন্তানের মঙ্গল কামনায় দেবী ষষ্ঠীর বদলে মহাদেব শিবের পূজা করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পালিত এই ব্রতটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিব-নীলাবতীর বিবাহের পৌরাণিক কাহিনি এবং এক আবেগঘন ব্রতকথা, যা বাংলার মায়েদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতীক।

গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিতে ‘ষষ্ঠী’ মানেই উর্বরতা ও সন্তানের মঙ্গলকামনার দেবী ষষ্ঠীর পূজা। অশোক ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠীর মতো নানা পার্বণে এই দেবীর আরাধনা করা হলেও নীল ষষ্ঠী একটু ভিন্ন স্বাদের। এই দিনে দেবী ষষ্ঠীর পরিবর্তে মহাদেব শিবের পূজা করা হয় সন্তানের কল্যাণ কামনায়। মঙ্গলকাব্যের কবির সেই চিরন্তন প্রার্থনা— “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”—আজও বাংলার মায়েদের হৃদয়ে গভীরভাবে অনুরণিত হয়, আর সেই আবেগই যেন নীল ষষ্ঠী ব্রতের মূল ভিত্তি।

নীল ষষ্ঠী পালিত হয় চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন, গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মধ্যেই। এদিন বহু নারী সারাদিন নির্জলা উপবাস পালন করেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়। সূর্যাস্তের পর মহাদেবের পূজা করে, শিবলিঙ্গে জল ঢেলে ব্রত ভঙ্গ করা হয়। যদিও পঞ্জিকা অনুযায়ী এই দিনটি সবসময় ষষ্ঠী তিথি নাও হতে পারে, তবুও প্রাচীন লোকাচার অনুসারে এই দিনেই নীল ষষ্ঠী পালিত হয়ে আসছে।

সাধারণত ষষ্ঠী মানেই ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা, কিন্তু নীল ষষ্ঠীতে দেখা যায় এক ভিন্ন প্রথা—এদিন মূলত শিবের পূজা করা হয়। এর পেছনে রয়েছে একটি পুরাণপ্রসূত কাহিনি।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সতী পিতার যজ্ঞে আত্মাহুতি দেওয়ার পর পুনর্জন্ম নেন রাজা নীলধ্বজের কন্যা হিসেবে, তাঁর নাম হয় নীলাবতী। পরে নীলাবতীর সঙ্গে মহাদেবের বিবাহ হয়। অনেকে মনে করেন, এই বিবাহ চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিনেই সংঘটিত হয়েছিল। সেই স্মৃতিতেই এই দিনটি নীল ষষ্ঠী নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

নীল ষষ্ঠী, চৈত্র সংক্রান্তি এবং গাজন—এই তিনটি উৎসব পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলার বহু অঞ্চলে এই সময় শিব-পার্বতীর বিবাহোৎসব হিসেবে পালিত হয় এই উৎসব। গাজনের সময় গ্রামবাংলায় শিব ও পার্বতী সেজে ভিক্ষা করার প্রথাও দেখা যায়, যা লোকসংস্কৃতির এক অনন্য দিক।

এই ব্রতের নাম ‘নীল ষষ্ঠী’ হওয়ার পেছনেও রয়েছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা। শিব ‘নীলকণ্ঠ’ নামে পরিচিত, কারণ সমুদ্র মন্থনের সময় তিনি কালকূট বিষ পান করেছিলেন। সেই নীলকণ্ঠ শিবের সঙ্গে নীলাবতীর বিবাহের স্মরণেই এই ব্রতের নামকরণ ‘নীল ষষ্ঠী’। অনেক স্থানে একে ‘নীল পুজো’ নামেও ডাকা হয়।

নীল ষষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক আবেগঘন ব্রতকথা। এক সময় এক ধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীর সমস্ত সন্তান অকালমৃত্যুর শিকার হন। শোকে ভেঙে পড়ে তারা কাশীতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। একদিন গঙ্গার ঘাটে এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর দুঃখের কথা শুনে তাঁকে নীল ষষ্ঠীর ব্রত পালনের পরামর্শ দেন।

বৃদ্ধার কথামতো ব্রাহ্মণী চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন উপবাস রেখে মহাদেবের পূজা করেন এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে জল পান করেন। এর পরেই তাঁর জীবনে আসে সুখের পরিবর্তন—তিনি আবার সন্তানের মুখ দেখেন। বিশ্বাস করা হয়, সেই বৃদ্ধা আসলে স্বয়ং ষষ্ঠী দেবী ছিলেন। এই ঘটনার পর থেকেই নীল ষষ্ঠীর ব্রত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নীল ষষ্ঠী শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার মায়েদের অন্তরের গভীরতম ভালবাসা, আশীর্বাদ ও সন্তানের জন্য অটুট প্রার্থনার প্রতীক। প্রাচীন লোকবিশ্বাস, পুরাণকাহিনি ও পারিবারিক আবেগ—সবকিছুর এক সুন্দর মেলবন্ধন এই ব্রতকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে বাংলার গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত।

PREV
Religion News (ধর্মের খবর): Read latest news and updates on religion in bengali , Spiritual News, Puja Vratham, Fasting Rule. Find Bengali Religious News, Spiritual News on Asianet Bangla News.
Read more Articles on
click me!

Recommended Stories

Nil Sasthi 2026: সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীলষষ্ঠী, মহাদেবকে পুজো দেওয়ার সঠিক সময় কখন?
অক্ষয় তৃতীয়া ২০২৬: সোনা না কিনলেও এই ৩টি জিনিস কিনলেই ভাগ্য ফিরবে