
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে স্নান, তারপর ঠাকুরঘরে ঢোকা। কোনওরকমে ফুল ছুঁড়ে, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে, ‘নমো নমো’ করে বেরিয়ে গেলেন। অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে।
বাড়ির বয়স্করা বলেন, ‘মন থাকলেই হল’। কিন্তু শাস্ত্র কী বলছে? গরুড় পুরাণ, মনুসংহিতা থেকে শুরু করে নিত্যকর্ম পদ্ধতি – সব জায়গায় বলা আছে, পুজো মানে শুধু উপাচার নয়, উপাসনা। মন, বাক্য আর শরীরের শুদ্ধতা লাগে।
পুরোহিত সুদীপ্ত চক্রবর্তী বলছেন, “আজকাল ৯০% বাড়িতে পুজো হয় নিয়ম না মেনে। ফল? ঠাকুরের কৃপা পান না। সংসারে রোগ, অশান্তি, টাকার টানাটানি লেগেই থাকে। ভগবান ফুল-মিষ্টি চান না, চান ভক্তি আর শুদ্ধতা।”
*তাহলে তাড়াহুড়োর পুজোয় কী কী ভুল হচ্ছে? ৮টি বড় ভুল:*
*১. স্নান না করে বা অশুদ্ধ বস্ত্রে পুজো*
অনেকে রাতে পরা গেঞ্জি-লুঙ্গি পরেই ঠাকুরঘরে ঢোকেন। বা স্নান না করে ‘মুখ ধুয়ে’ পুজো সারেন। শাস্ত্র মতে, স্নান ছাড়া পুজো নিষ্ফল। শরীর শুদ্ধ না হলে মন শুদ্ধ হয় না।
*ঠিক নিয়ম:* স্নান করে ধোয়া কাপড় পরুন। সিল্ক বা সুতির বস্ত্র শ্রেষ্ঠ। অন্তত হাত-পা-মুখ ধুয়ে, কাচা গামছা পরে পুজো করুন।
*২. আসন শুদ্ধি না করা*
মেঝেতে বসেই পুজো শুরু করে দেন অনেকে। আসন শুদ্ধি না করলে পুজোর ফল রাক্ষস-যক্ষরা নিয়ে নেয়, শাস্ত্র বলছে।
*ঠিক নিয়ম:* কুশের আসন, কম্বলের আসন বা কাঠের পিঁড়িতে বসুন। বসার আগে জল ছিটিয়ে মন্ত্র বলুন – ‘ওঁ আসন শুদ্ধি মন্ত্র’। না জানলে ‘ওঁ শ্রী গুরবে নমঃ’ বলে বসুন।
*৩. বাসি ফুল, বেলপাতা, জল দেওয়া*
আগের দিনের কেনা ফুল, ফ্রিজে রাখা বেলপাতা, কলের জল সরাসরি দিয়ে দিচ্ছেন। বাসি ফুলে দেবতা বাস করেন না। তুলসী ছাড়া সব ফুল ১ প্রহর পর বাসি।
*ঠিক নিয়ম:* টাটকা ফুল তুলুন বা সকালে কিনুন। গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জলে সামান্য কর্পূর মিশিয়ে দিন। বেলপাতা, তুলসী ধুয়ে দিন।
*৪. মন্ত্র ভুল উচ্চারণ ও তাড়াহুড়ো*
ইউটিউব দেখে মন্ত্র মুখস্থ করেছেন, কিন্তু উচ্চারণ ভুল। বা এত জোরে বলছেন যে নিজেই বুঝছেন না। শাস্ত্র বলে, মন্ত্রের ভুল উচ্চারণে দেবতার বদলে অপদেবতা আসে।
*ঠিক নিয়ম:* ছোট মন্ত্র বলুন কিন্তু শুদ্ধ বলুন। ‘ওঁ নমঃ শিবায়’, ‘হরে কৃষ্ণ’ – এই নাম জপই যথেষ্ট। আস্তে, স্পষ্ট করে, মানে বুঝে বলুন।
*৫. ঠাকুরের দিকে পা করে বসা বা পিছন ফেরা*
তাড়াহুড়োয় খেয়াল থাকে না। পা ছড়িয়ে বসছেন, ঠাকুরের দিকে পা চলে যাচ্ছে। বা ফোন এলে পিছন ফিরে কথা বলছেন। এটা ঘোর অপরাধ।
*ঠিক নিয়ম:* সুখাসনে বা পদ্মাসনে বসুন। ঠাকুরের সামনে মেরুদণ্ড সোজা রেখে বসুন। পুজোর সময় ফোন সাইলেন্ট।
*৬. নিবেদন না করে নিজে খাওয়া*
ঠাকুরকে ভোগ না দিয়ে আগেই চা-বিস্কুট খেয়ে নিলেন। বা বাচ্চাকে প্রসাদ না দিয়ে আগে খাইয়ে দিলেন। এতে অন্নদোষ হয়।
*ঠিক নিয়ম:* আগে ঠাকুরকে নিবেদন করুন। বাতাসা, ফল, মিছরি – যা পারেন। ‘ওঁ তৎ সৎ’ বলে নিবেদন করে তবে নিজে খান।
*৭. দীপ ও ধূপ নিভে যাওয়া*
ধূপ জ্বালিয়ে বেরিয়ে গেলেন, মাঝপথে নিভে গেল। বা ঘি-এর প্রদীপ কাঁপতে কাঁপতে নিভল। এটা অশুভ সংকেত।
*ঠিক নিয়ম:* যতক্ষণ পুজো করবেন, দীপ-ধূপ জ্বলবে। তেল বা ঘি বেশি দিন। পুজো শেষে নিজে হাতে নেভাবেন না, ফুঁ দেবেন না। হাত দিয়ে বা ফুল দিয়ে নিভিয়ে দিন।
*৮. মন অন্য দিকে, মুখে মন্ত্র*
হাত চলছে, মুখে মন্ত্র, কিন্তু মন অফিসের মিটিংয়ে। বা কড়াইয়ে কী পুড়ছে ভাবছেন। গীতা বলছে, ‘অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং’ – অশ্রদ্ধায় করা পুজো, দান সব বৃথা।
*ঠিক নিয়ম:* ৫ মিনিট পুজো করুন, কিন্তু ৫ মিনিট মন দিন। চোখ বন্ধ করে ঠাকুরের রূপ চিন্তা করুন। এটাই ‘ধ্যান’।
*তাহলে উপায়? ৫ মিনিটে শুদ্ধ পুজো কীভাবে?*
পুরোহিতরা বলছেন, সময় কম থাকলে ‘পঞ্চোপচার’ পুজো করুন। লাগবে মাত্র ৫ মিনিট।
*ধাপ ১: গন্ধ – ৩০ সেকেন্ড*
স্নান করে এসে ঠাকুরকে চন্দন বা অগুরু দিন। না থাকলে জলের ছিটে দিন।
*ধাপ ২: পুষ্প – ১ মিনিট*
টাটকা ফুল বা বেলপাতা দিন। মনে মনে বলুন, ‘এষ গন্ধপুষ্পে ওঁ [দেবতার নাম] নমঃ’।
*ধাপ ৩: ধূপ – ১ মিনিট*
ধূপ জ্বালান। বলুন, ‘এষ ধূপ ওঁ [দেবতার নাম] নমঃ’।
*ধাপ ৪: দীপ – ১ মিনিট*
ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালান। বলুন, ‘এষ দীপ ওঁ [দেবতার নাম] নমঃ’।
*ধাপ ৫: নৈবেদ্য ও প্রণাম – ১.৫ মিনিট*
বাতাসা বা ফল দিন। বলুন, ‘এষ নৈবেদ্য ওঁ [দেবতার নাম] নমঃ’। শেষে চোখ বন্ধ করে প্রণাম মন্ত্র বলুন। শিব হলে ‘নমঃ শিবায়’, কালী হলে ‘জয় মা’। ১ মিনিট চুপ করে বসুন।
মোট ৫ মিনিট। কিন্তু মন দিয়ে করলে এটাই সম্পূর্ণ পুজো।
*শেষ কথা:*
ভগবান ভাবের কাঙাল, উপাচারের নন। কিন্তু ভাব মানে ‘যেমন খুশি’ নয়। শ্রদ্ধা, শুদ্ধতা, নিয়ম – এই তিন থাকলে ১টা তুলসী পাতাতেই তুষ্ট হন।
কাল থেকে ঘড়ি দেখে নয়, মন দিয়ে পুজো করুন। দেখবেন, ৫ মিনিটের পুজোই আপনার দিনটা বদলে দেবে। সংসারে শান্তি আসবে। কারণ ঠাকুরঘর থেকে পজিটিভ এনার্জি বেরোবে।
তাড়াহুড়ো করে অপরাধ না বাড়িয়ে, শুদ্ধ মনে প্রণাম করুন। উনিই সব দেখছেন।