
Shantipur Bamakali: কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের "একবার নাচো, নাচো গো শ্যামা নাচো এমন করে"- এই গান শুনলেই যেই দৃশ্য আপামর বাঙালির চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেই হল নদিয়ার শান্তিপুরের অন্যমত আকর্ষণ বামাকালীর নাচ। মোবাইলে রিলসের দুনিয়ায় যাঁদের বিচরণটা একটু বেশি তারা এই গান শুনলেই বলে দিতে পারবেন, আর কমবেশি আমাদের প্রায় সবারই এই বামা কালীর নাচের রিলস মোবাইলে দেখা।
শান্তিপুর মানেই বৈষ্ণব সংস্কৃতি, শাক্ত সাধনা, তাঁতশিল্প এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই মাটিতে যেমন শ্রীচৈতন্য-এর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, তেমনই রয়েছে কালীসাধনা ও তন্ত্রাচারের স্বতন্ত্র ইতিহাস রয়েছে। আর শান্তিপুরের কালীপুজোর জগতে বিশেষ আকর্ষণই হল বামাকালী। এই পুজোর ইতিহাস নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই বলেন বামাকালী পুজো প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন, আবার অনেকে বলেন বামাকালী পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৯৬৯ সালে ঘটপুজোর মাধ্যমে এবং ১৯৭০ সালে শুরু হয় প্রতিমাপুজো।
বামাকালী রূপের বিশেষত্ব বলতে, সাধারণ দক্ষিণাকালীর মূর্তিতে দেবী শিবের বুকে ডান পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু শান্তিপুরের বামাকালী মূর্তিতে দেবী শিবের বুকে বাম পা রেখে অবস্থান করেন। এই বিশেষ ভঙ্গির কারণেই তাঁর নাম হয়েছে বামাকালী। শাক্ত দর্শনে, কালী কেবল ধ্বংসের দেবী নন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ, অজ্ঞানতার অবসান এবং সৃষ্টির শক্তির প্রতীক। বামাকালীর এই বিশেষ রূপও গভীর অন্ধকারে জ্যোতিষ্কের মতো। এই দেবীর হাতে খড়্গ, গলায় মুণ্ডমালা এবং মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠে শক্তি, তেজ প্রকাশ পয়েছে। তাঁর এই ভয়াল রূপের মধ্যেও ভক্তরা মঙ্গলময়ী মাতৃশক্তির খোঁজ পেয়েছে।
বামাকালী পুজোর সূচনাকে ঘিরে যে কাহিনি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তার কেন্দ্রে রয়েছেন যমুনা চৌধুরী। জনশ্রুতি ও প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, যমুনা চৌধুরী একদিন স্বপ্নে দেবী কালীর দর্শন পান। কথিত আছে, দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে নিজের আরাধনা শুরু করার নির্দেশ দেন। এইভাবে এক ভক্তের স্বপ্নাদেশকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আরাধনা ধীরে ধীরে শান্তিপুরের অন্যতম জনপ্রিয় কালীপুজোয় পরিণত হয়।
বর্তমান সময়ে যেখানে অধিকাংশ কালীপুজো বৈদ্যুতিক আলো, রঙিন এলইডি ও আধুনিক আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়, সেখানে বামাকালী পুজোয় অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে ওঠে মশাল, মোমবাতি ও প্রদীপের আলো। পুজোর রীতি অনুসারে, পুজোর শুরু থেকে প্রতিমা নিরঞ্জন পর্যন্ত বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার করা হয় না। প্রদীপ, মোমবাতি, হ্যাজাক এবং মশালের আলোতেই দেবীর আরাধনা সম্পন্ন হয়। সময়ের পরিবর্তন হলেও পুরানো ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন পুজোর উদ্যোক্তারা। অন্ধকারের মধ্যে মশালের আলোয় বিশাল দেবীমূর্তির আবির্ভাব এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে।
বামাকালী পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয় বিসর্জনের আগে দেবীর নৃত্য দেখতে। কালীপুজোর পরদিন দেবীকে বিসর্জনের জন্য মণ্ডপ থেকে বের করা হয়। বিশাল প্রতিমাকে একটি বিশেষ বাঁশের কাঠামোর উপরে স্থাপন করা হয়। এরপর বহু ভক্ত সম্মিলিতভাবে কাঁধে সেই কাঠামো তুলে নেন। ঢাক ছাড়াও কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ এবং অসংখ্য ভক্তের জয়ধ্বনির মধ্যে শুরু হয় বামাকালীর নৃত্য। এই দৃশ্য দেখতে শান্তিপুর তো বটেই, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অসংখ্য মানুষ উপস্থিত হন। মশালের আলোয় দেবীর মূর্তি, ঢাকের তালে তালে ভক্তদের কাঁধে নৃত্য, বিসর্জনের মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের আবেগ এবং দেবীকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন বয়সের লোককথা—সব মিলিয়ে বামাকালী পুজো এক অনন্য জনপ্রিয়তা লাভ করছে।