
বিশ্বকর্মা পুজো আসলেই বাঙালির মনে একটাই ছবি ভাসে - সকাল থেকে কারখানায় পুজো, দুপুরে খিচুড়ি ভোগ আর বিকেল হলেই ছাদে ছাদে "ভো-কাট্টা" চিৎকার। কিন্তু যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার সাথে ঘুড়ির সম্পর্কটা কোথায়? কেন এই দিনেই ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ?
আসলে এর পিছনে ৩টি বড় কারণ আছে
১. পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কারণ:
বলা হয়, বিশ্বকর্মা দেবতা নিজে ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারিগর ও স্থপতি। তিনি দেবতাদের জন্য অস্ত্র, প্রাসাদ সব বানাতেন। ঘুড়ি বানানো এবং ওড়ানোও এক ধরনের কারিগরি শিল্প। নিখুঁত ভাবে ঘুড়ি বানানো, সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া, হাওয়ার গতিবেগ বুঝে ঘুড়ি ওড়ানো - এর মধ্যেও কারিগরির ছাপ আছে। তাই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে নিজের হাতের কারিগরি দক্ষতা আকাশে তুলে ধরে দেবতাকে সম্মান জানান শ্রমিক ও কারিগররা। এটা অনেকটা দেবতাকে নিজের কাজ দেখানোর মতো।
আবার অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, আগে এই সময়েই জমিদাররা কারখানার শ্রমিকদের একদিনের ছুটি দিতেন। সারাবছর যন্ত্রের সাথে থাকা মানুষগুলো এই একটা দিন আনন্দ করতেন ঘুড়ি উড়িয়ে। সেই থেকেই এটি উৎসবে পরিণত হয়েছে।
২. বৈজ্ঞানিক ও ঋতু পরিবর্তনের কারণ:
এই কারণটি সবচেয়ে চমকপ্রদ। বিশ্বকর্মা পুজো হয় ভাদ্র মাসের শেষে, যখন বর্ষা বিদায় নেয় এবং শরৎ আসে। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে, হাওয়ার গতিবেগ ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য একেবারে আদর্শ থাকে।
আয়ুর্বেদ মতে, বর্ষার পর শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধে। এই সময় রোদে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়ালে শরীরে ভিটামিন D প্রবেশ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তাই আমাদের পূর্বপুরুষরা আনন্দের ছলে শরীর সুস্থ রাখার এই উপায় বের করেছিলেন।
৩. বার্তা পাঠানোর প্রতীক:
আগেকার দিনে মনে করা হত, ঘুড়ি যত উপরে উঠবে, তত দেবতাদের কাছে আমাদের প্রার্থনা তাড়াতাড়ি পৌঁছাবে। বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে ঘুড়ি উড়িয়ে শ্রমিকরা দেবতার কাছে তাদের ভালো থাকার, কারখানার সমৃদ্ধির প্রার্থনা জানাতেন।
তাই বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি ওড়ানো শুধু একটা খেলা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং আবেগের এক সুন্দর মিশেল। এবার ঘুড়ি ওড়ানোর সময় এই ইতিহাসটা মনে পড়লে আনন্দটা আরও বেড়ে যাবে।