চোখ আমাদের কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু মানুষের চোখকে যদি ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সেটা কত মেগাপিক্সেলের সমান হবে? কখনও ভেবে দেখেছেন কি?
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই শোনা যায়, মানুষের চোখের ক্ষমতা নাকি 576 মেগাপিক্সেল। কিন্তু এটা চোখের আসল রেজোলিউশন নয়। ক্যামেরাকে যেমন মেগাপিক্সেলে মাপা হয়, মানুষের চোখকে তেমন একটি সংখ্যা দিয়ে মাপার এটা একটা আনুমানিক চেষ্টা মাত্র। আমাদের চোখের রেটিনায় প্রায় ১২ কোটি রড কোষ এবং ৬০ লক্ষ কোন কোষ থাকে। রড কোষ কম আলোতে দেখতে ও নড়াচড়া ধরতে সাহায্য করে। আর কোন কোষ রঙ এবং সূক্ষ্ম ডিটেল চিনতে পারে। তাই 576MP সংখ্যাটিকে চোখের আসল ক্ষমতা ভাবা ঠিক নয়।
25
আমাদের মনে হয়, চারপাশের সবকিছু আমরা একবারে স্পষ্ট দেখছি। কিন্তু আসলে চোখ পুরো দৃশ্যটা একই রকম স্পষ্ট দেখে না। চোখের যে অংশে সবচেয়ে পরিষ্কার দেখা যায়, তাকে বলে ফোভিয়া (Fovea)। আমরা যখন কোনও কিছুর দিকে মনোযোগ দিই, তখন চোখ ছোট ছোট নড়াচড়ার মাধ্যমে সেই বস্তুর প্রতিবিম্ব ফোভিয়ার ওপর ফেলে। তাই আমরা সামনের ব্যক্তির মুখ বা বইয়ের অক্ষর স্পষ্ট দেখি। একই সময়ে, পাশের জিনিসগুলো ততটা স্পষ্ট না হলেও, তাদের নড়াচড়া বা আকৃতি আমরা ঠিকই বুঝতে পারি। একে পেরিফেরাল ভিশন (peripheral vision) বলা হয়।
35
আলোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া আমাদের চোখের এক অসাধারণ ক্ষমতা। যেমন, উজ্জ্বল আলো থেকে অন্ধকার ঘরে ঢুকলে প্রথমে কিছুই দেখা যায় না। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে জিনিসপত্র চোখে পড়ে। অন্ধকারে রড কোষ বেশি কাজ করে, যা কম আলোতে দেখতে সাহায্য করে। আর ভালো আলোতে কোন কোষ সক্রিয় হয়ে রঙ ও সূক্ষ্ম জিনিস চিনতে সাহায্য করে। তবে মানুষের চোখ সব ধরনের আলো দেখতে পায় না। আমরা সাধারণত ৩৮০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটারের মধ্যে থাকা আলোই (Visible Light) দেখতে পাই। এর বাইরের আলট্রাভায়োলেট বা ইনফ্রারেড রশ্মি আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।
45
আমরা যা দেখি, তা শুধু চোখ একাই তৈরি করে না। এতে মস্তিষ্কেরও বড় ভূমিকা আছে। আলো চোখে ঢোকার পর রেটিনায় পড়ে। সেখানকার কোষগুলো আলোর তথ্যকে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত করে। এই সংকেত অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্ক সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝায় যে আমরা কী দেখছি, তার রঙ কী, কত দূরে আছে বা তার আকৃতি কেমন। অর্থাৎ, আমরা যা দেখি তা হল চোখ, অপটিক নার্ভ এবং মস্তিষ্কের একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। তাই শুধু মেগাপিক্সেল দিয়ে চোখের ক্ষমতা মাপা ঠিক নয়।
55
576 মেগাপিক্সেল সংখ্যাটিকে চোখের ক্ষমতার সঠিক পরিমাপ হিসেবে ধরা ঠিক নয়। একটি ক্যামেরা নির্দিষ্ট রেজোলিউশনে ছবি তোলে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি ক্রমাগত বদলাতে থাকে। মানুষের চোখ আলো, রঙ, নড়াচড়া, গভীরতা, দূরত্ব এবং পারিপার্শ্বিক পরিবর্তন—এরকম অনেক কিছু একবারে ধরতে পারে। মস্তিষ্ক চোখের ছোট ছোট নড়াচড়া থেকে পাওয়া তথ্যগুলোকে একত্রিত করে আমাদের একটি স্পষ্ট দৃশ্য দেখায়। তাই 'মানুষের চোখ 576MP'—এটা শুধু একটি ধারণা। এটি চোখের আসল রেজোলিউশন নয়।