
'ডুগডুগডুগডুগ দেখো বাবু খেলা দেখো রে...
বাঁদর লাচবে, বাঁদরি লাচবে, আসমান থিকা পয়সা পড়বে...'
এ যেন মাদারির খেলা। রীতিমতো কম্পিটিশন চলছে। কে কার আগে গেরুয়া আবিরে রেঙে প্রমাণ করবে, গুরু আমি কিন্তু বিজেপি করি!
আমি টালিগঞ্জের বাসিন্দা। আমার বাড়ির কাছেই বেশ কয়েকটি তৃণমূলের পার্টি অফিস রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এক্কেবারে শাটার টানা। ইয়া বড় বড় তালা ঝোলানো। গুটিকতক তৃণমূল সমর্থক যারা নিত্যদিন ওই পার্টি অফিসে বসে খেলা এবং খবর দেখতেন তাদের কয়েকজনকেও দেখতে পেয়েছি। কয়েক জনকে মনমরাও মনে হয়েছে। কিন্তু আজ সকালের মধ্যেই বিরাট পরিবর্তন! কোথায় তৃণমূলের পতাকা, কোথায় জোড়াফুল আঁকা মমতা-অভিষেক-অরূপের ছবি সাঁটা পার্টি অফিসের বোর্ড। সব ভোঁ ভাঁ। বিজেপির পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে পার্টি অফিস। শুধু শাটার খোলাই বাকি। এদের আবির খেলা দেখে স্থানীয়রা সকলেই মুচকি হাসছেন। কেউ কেউ বিরক্তও হচ্ছেন। অন্তত শোনা যায় এমন স্বরেই বলছেন, 'এদের কাছ থেকে গিরগিটিও টিউশন নিতে পারে।'
এর আগেও অনেক প্রতিবেদনে পড়েছি এবং পডকাস্ট দেখে মনে হয়েছে, তৃণমূল দলটা কেউ আদর্শের জন্য করে না। অনেকেই আড়ালে এতদিন TMC-কে টাকা মারা কোম্পানি বলতেন। এখন যদিও প্রকাশ্যেই বলছেন। তা টাকা যারা মারত তারাই তো গেরুয়া আবিরে রেঙে উঠেছে! যারা পাড়ায় পাড়ায় সিন্ডিকেট চালাত, বহু মানুষের উপর যথেষ্ট অত্যাচার করেছে, তারা রাতারাতি অন্য দলে গিয়ে একেবারে রত্নাকর থেকে বাল্মীকি হয়ে উঠছেন তা তো হলফ করে বলা যায় না! তাহলে এই 'বেনো জল'রা সবটাই এখন বাঁধ ভাঙা বন্যার জলের মতো বিজেপির উর্বর জমিতে ফসল ফলাতে তৈরি।
আর নিচুতলার কর্মীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, ভোটের ফল বেরনোর আগেই বিদায়ী মন্ত্রী এবং বিধায়ক অরূপ বিশ্বাস স্থানীয় এক বিজেপি নেত্রীর সোনারপুরের বাগানবাড়িতে বিপ্লব দেবের সঙ্গে রীতিমতো মিটিং করে এসেছেন। তালিকায় সুজিত বসু, সব্যসাচী দত্ত-সহ আরও অনেক হোমড়া চোমড়াদের নাম শোনা যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষজন তো অরূপকে নতুন নামকরণও করে ফেলেছেন। অবশ্য খুব নতুন বলা যায় না। সেই যুবভারতীতে মেসি কাণ্ডের পর 'ক্রিয়া' মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওযার পর থেকেই আড়ালে মেসি-অরূপ বলে ডাকা শুরু হয়েছে। অনেকে টিপ্পনী কেটে বলেছেন, 'টালিগঞ্জে তৃণমূল একটা নীল-সাদা জিনিস দেখলেই খচে যাচ্ছে। মেসির ১০ নম্বর জার্সি।' যদিও এখন প্রকাশ্যেই বলছেন।
হারার পর থেকে অরূপকে এলাকায় দেখা যায়নি। টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়া থেকে সাধারণ ভাবে এলাকায় তাঁর নামে খুব একটা সুনাম করতে কাউকেই দেখা যায় না। যারা করেন তারা এত দিন ভয়েই করেছেন। কারণ আশা করি বলে দিতে হবে না। বারোয়ারি মন্দিরের প্রণামীর বখরা, মাঠ দখল করে দোকান বিক্রি, সিন্ডিকেট সব কিছুতেই অরূপের নাম জড়িয়ে থাকত। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়ে যে বিশেষ লাভ হবে না তা বিলক্ষণ সকলেই জানতেন। সম্মুখে সকলে অস্বীকার করলেও, আড়ালে সকলেই এ নিয়ে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারই প্রতিফলন হয়েছে ভোটবাক্সে।
এখন এই দৃশ্য শুধু টালিগঞ্জের, না সমগ্র রাজ্যের, তা জানতে আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে টালিগঞ্জে তৃণমূল কর্মী, মাপ করবেন, প্রাক্তন তৃণমূল কর্মীদের প্রসেসর যে বেশ দ্রুত গতিতে ছোটে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। আর শুধু এরাই কেন, রিক্সাচালক, অটোচালক, দোকান - সমস্ত ক্ষেত্রেই তৃণমূলের পতাকা সরিয়ে রাতারাতি জায়গা করে নিয়েছে পদ্ম-পতাকা। একই ধরনের না হলেও নিচুতলার অনেক সুবিধাবাদী বাম কর্মীরা রাতারাতি ভোল বদলেছিলেন ২০১১ সালে। অনেকে মারধর খেয়ে, অনেকে পুলিশ কেসের ভয়ে, অনেকে অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে, এবং বেশিরভাগ স্রেফ টাকা কামানোর ধান্দায় তৃণমূলে নাম লিখিয়েছিলেন। আগেই বলেছি, তৃণমূল কেউ আদর্শের জন্য করে না। তবে রেজিমেন্টেড দল হিসাবে বিজেপি-র একটা নীতি আদর্শ রয়েছে বলেই জানি। কিন্তু এই বেনোজল দলে সামিল হলে সেই আদর্শ ড্রেনের জলে প্রবাহিত হবে না সেটা কি বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব জোর দিয়ে বলতে পারেন?
তৃণমূল এই ভুল খানিকটা জেনে শুনেই করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটাই নীতি দেখা গিয়েছ গত ১৫ বছরে। ভোটের সময় আমায় জেতাও। তার বদলে যা খুশি করার মৌরুসী পাট্টা দিয়ে রেখেছিলেন এই অনিয়ন্ত্রিত বেনোজলকে। অর্থাৎ, আমি এবং দল জিতে গেলে তোরা যা খুশি করিস। যেমন খুশি লুঠ-তরাজ চালাস। শুধু ভাগটা পৌঁছে দিস। তাহলেই হবে। এমন একটা অলিখিত চুক্তি কাজ করেছে। এমনটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। এই অনিয়ন্ত্রিত বেনো জল এখন খানিক মার খাওয়ার ভয়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কামাই যাতে বন্ধ না হয় তার জন্য গিরগিটিকে লজ্জা দিয়ে 'গেরুয়াধারী' হয়েছে।
জয় শ্রী রাম ধ্বনি দেওয়া বিজেপি সমর্থকরা এটা ভালো করেই জানেন, গেরুয়া পরেই বারণ সীতাকে হরণ করেছিলেন। গেরুয়া পরলেই তো আর ত্যাগী হওয়া যায় না। আর এরা মল-মূত্র ছাড়া বিশেষ কিছু ত্যাগ করেন বলে খুব একটা শোনা যায় না। এদের অতিবড় সমর্থকও বলতে পারেননি। ফলে সাধু সাবধান! বেনো জলে ভরে গেলে পার্টির অবস্থা কী হতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ তৃণমূল নিজেই । তার আগেও বাম দলগুলি এই ভুল করেছে। আর এই বেনো জলদের জন্য যখনই কোনও দল রাজনৈতিক ময়দানে হেরেছে, তারা পুরোপুরিই হেরেছে। ফিরে আসার পথ পায়নি।
বিজেপি কি একই ভুল করবে?
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.