
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক বিজয়ের পর এখন সকলের দৃষ্টি রয়েছে কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী এবং নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হবে তার উপর। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০৭টি আসন জিতে বিজেপি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের ১৫ বছরের রাজনৈতিক দুর্গই ভেঙে দেয়নি, বরং বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের তত্ত্বাবধানে শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিষদীয় দলের সভায় মুখ্যমন্ত্রীর নাম চূড়ান্ত করা হবে, আর সকলের নজর এখন মন্ত্রিসভার গঠনের দিকে।
বাংলার মন্ত্রিসভা কেমন হবে?
বাংলায় বিজেপির মন্ত্রিসভায় 'সামাজিক কৌশল' এবং 'আঞ্চলিক ভারসাম্য'-এর মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য স্থাপনের চেষ্টা করা হবে। বিজেপির লক্ষ্য হল উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও মতুয়া সম্প্রদায় এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। উত্তরবঙ্গ, যেখানে দলটি অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে, জঙ্গলমহল ও দক্ষিণবঙ্গের প্রভাবশালী জেলাগুলো থেকে বিশেষ অগ্রাধিকার পেতে পারে।
বিজেপি মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ এবং তরুণ উভয় নেতাই থাকবেন, যাঁরা তৃণমূল স্তরে টিএমসি-র বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এছাড়াও, বিজেপির বিজয়ে নারী ও দলিত এজেন্ডা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলস্বরূপ, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী এবং তফসিলি জাতি/উপজাতি (এসসি/এসটি) নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। নতুন পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভা এমনভাবে গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে আদর্শগত অঙ্গীকার বজায় থাকে এবং তৃণমূলস্তরে সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়। বিজেপি এবং আরএসএস-এর মধ্যে সাম্প্রতিক সমন্বয় সভাগুলিতে, আরএসএস আদর্শগত ঐক্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে। বিজেপি সেইসব নেতাদের উপর মনোযোগ দিচ্ছে যাঁদের আরএসএস-এর সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দলটি মন্ত্রিসভায় যত বেশি সম্ভব অভিজ্ঞ নেতা অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রাখছে। এইভাবে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভায় প্রবীণ এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে চায়।
কোন নেতারা মন্ত্রী পদের দৌড়ে আছেন?
ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর পর দলে শুভেন্দু অধিকারীর মর্যাদা আকাশচুম্বী হয়েছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী না হলেও, তাঁর ব্যাপক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে সবচেয়ে শক্তিশালী স্বরাষ্ট্র বা অর্থ মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হতে পারে। শমীক ভট্টাচার্য বিজেপির রাজ্য সভাপতি এবং মন্ত্রী পদের দৌড়ে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
ডিজাইনার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া অগ্নিমিত্রা পাল নারী ভোটব্যাঙ্ককে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাই, তিনি মুখ্যমন্ত্রী না হলেও তাঁর মন্ত্রী পদ প্রায় নিশ্চিত। প্রবীণ বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাও সরকারের জন্য সহায়ক হতে পারে। তাই, ঘোষকে মন্ত্রী পদের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রমাণিক, ব্যারাকপুরের বিধায়ক অর্জুন সিং, মুর্শিদাবাদ থেকে দুইবারের বিধায়ক গৌরী শঙ্কর ঘোষ, ভিএইচপি-র পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রাক্তন সভাপতি শ্রুতি শেখর গোস্বামী, প্রাক্তন সাংসদ রূপা গঙ্গেপাধ্য়ায়, আইনজীবী কৌস্তভ বাগচী, দীপক বর্মণ, সজল ঘোষ, ইন্দ্রনীল খান এবং জোয়েল মুর্মুও মন্ত্রিসভার পদের জন্য দৌড়ে রয়েছেন। প্রথমবারের মতো বিজেপি বিধায়ক নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন অভয়ার মা রত্না দেবনাথ, ভারত সেবাশ্রম সংঘের সন্ন্যাসী উৎপল মহারাজ (যিনি রাজনীতিতে আসার জন্য সংঘ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন), প্রাক্তন আইপিএস কর্মকর্তা রাজেশ কুমার এবং প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডো দীপঞ্জন চক্রবর্তী।
বিজেপি কীভাবে সামাজিক সমীকরণে ভারসাম্য আনবে?
বাংলায় বিজেপির বিজয়ের একটি প্রধান স্তম্ভ হল মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক। এই সম্প্রদায় থেকে অন্তত দুই বা তিনজন মন্ত্রী নিয়োগ করা হতে পারে। অসীম সরকার বা মুকুটমণি অধিকারীর মতো মতুয়া নেতারা মন্ত্রী হতে পারেন। একইভাবে, উত্তরবঙ্গ বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হওয়ায় এখানে নিশীথ প্রামাণিক এবং দীপক বর্মনের মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
‘বনবাসী’ তাসকে শক্তিশালী করতে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রাম থেকে একজন বিশিষ্ট আদিবাসী নেতাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এঁদের মধ্যে জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো বা তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনও বিধায়ক থাকতে পারেন।
শাহের ‘মাস্টার প্ল্যানে’ কারা খাপ খাবেন?
অমিত শাহের কৌশল স্পষ্ট: বাংলার সরকার এমন হওয়া উচিত যা ২০২৬ সালের রাজনৈতিক রায়কে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং তার পরেও সমুন্নত রাখবে। মন্ত্রী বাছাই প্রক্রিয়ায় তাঁদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কলকাতা ও শিলিগুড়ির মতো নগর কেন্দ্রগুলির উন্নয়নের জন্য দূরদর্শী নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। বাংলায় বিজেপির প্রথম সরকার কেবল একদল মন্ত্রী হবে না, বরং হবে দলটির ‘বেঙ্গল মডেল’, যা তারা নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন দেখার বিষয়, শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য অমিত শাহের তালিকায় কাদের নাম উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। বাংলায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ৯ মে নির্ধারিত হয়েছে।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.