
জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ECI) এবং ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (SIR) নিয়ে বিতর্ক চলছেই। এর মাঝেই রবিবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করলেন, ভোটার তালিকা থেকে যে ২৭ লাখ নাম বাদ গেছে, তা সরকারি আধিকারিকরা করেননি। বরং বিচারব্যবস্থার নির্দেশেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অকারণে আদালতের সমালোচনা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদসংস্থা এএনআই-কে শুভেন্দু বলেন, "বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় যে ২৭ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তা কোনও সরকারি অফিসার করেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। এরপর সুপ্রিম কোর্ট জেলা বিচারকদের নিয়োগ করে। আর ওই জেলা বিচারকরাই এই নামগুলো বাদ দিয়েছেন। তাই উনি আসলে বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধেই কথা বলছেন।" তিনি আরও বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজটা সরকারি অফিসাররা করেননি, করেছে আদালত। সুপ্রিম কোর্ট ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে ইআরও-র (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়। সরাসরি জেলা বিচারকদের ওই নামগুলো বাদ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এখন বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা মানে বাবাসাহেব আম্বেদকরের সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করা।"
গত ফেব্রুয়ারিতেই সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে একটি বিশেষ অনুমতি দেয়। বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় জমা পড়া আপত্তিগুলো খতিয়ে দেখতে তিন বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অতিরিক্ত সিভিল জজ নিয়োগ করা যাবে। দরকার হলে ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের সাহায্য নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
বিরোধী দলগুলো যেখানে জিতেছে আর যেখানে হেরেছে, সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে তাদের আলাদা আলাদা অবস্থান। এই দ্বিচারিতা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন শুভেন্দু।
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়া জোটের একটি বৈঠক হওয়ার কথা। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী এবং এম এ বেবির উচিত কেরলে গিয়ে যৌথ সভা করা। কংগ্রেস কেরলে জিতেছে, তাই সেখানকার ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ ওদের কাছে খুব ভালো। কিন্তু বিহারে কংগ্রেস আর মমতা পুরোপুরি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে, তাই সেখানকার পরিস্থিতি ওদের চোখে খারাপ।"
শনিবার নির্বাচন কমিশনের কাজ নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়তে চাইছে বাম ও তৃণমূল কংগ্রেস। বিরোধীদের আক্রমণ করে শুভেন্দু বলেন, "ওরা শেষ হয়ে গেছে। সারা রাজ্য থেকে নিজেদের চামচা আর দুর্নীতিগ্রস্তদের জড়ো করে ১৫০ জনকে নিয়ে ওরা একটা মিটিং করতেই পারে। কিন্তু তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। এখানে কিচ্ছু বদলাবে না। বিজেপি এখানে তিন প্রজন্ম ধরে থাকবে। আপনাদের ছেলে-নাতিরাও দেখবে যে বিজেপি একশো বছর ধরে ক্ষমতায় আছে।"
মমতার অভিযোগ
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যকে টার্গেট করা হচ্ছে। মমতা বলেছিলেন, "কেন এই স্পেশাল রিভিশন করা হল? শুধু বাংলা দখল করার জন্য এটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ ওরা অন্য কোনওভাবে জিততে পারত না। এই সংশোধনের নামে ৯২ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরাই প্রথম দল যারা এই বিষয়টা তুলে ধরেছিলাম। শুরুতে প্রায় ৭০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। আমরা আদালতে গিয়ে ৩২ লাখ নাম ফেরাতে পেরেছি। তবুও ২৭ লাখ নাম বাদ রয়ে গেছে। শুধু বাংলাতেই আপনারা ৯২ লাখ নাম বাদ দিয়েছেন। আর গোটা দেশে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ এই প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন।"
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকে একজোট করার উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছিলেন মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি ইন্ডিয়া জোটের বাইরের দলগুলোকেও এই লড়াইয়ে শামিল করার ডাক দিয়েছেন।
SIR ইস্যু
এই বিতর্কের সূত্রপাত 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি রিপোর্ট থেকে। সেখানে দাবি করা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন আপত্তি জানিয়েছিলেন। রিপোর্টে বলা হয়, কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী তাঁদের অজান্তে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরুদ্ধে একাধিকবার সরব হয়েছিলেন। অন্যদিকে, জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ECI) নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তারা জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সূচি সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত 'কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদন' নিয়েই নেওয়া হয়েছে। কমিশন আরও জানায়, ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো একটি চিঠি ডেপুটেশনে থাকা এক অফিসারের কাজ নিয়ে ছিল, কমিশনের কোনও নীতিগত বিষয় নিয়ে নয়।
একটি প্রেস নোটে কমিশন জানিয়েছে, ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকা সংশোধনের সূচি প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর। আর ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সূচি প্রকাশ করা হয় ২০২৬ সালের ১৪ মে। এই সব সিদ্ধান্তই সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য ভোটার তালিকা সংশোধনের যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল, সেটাও সর্বসম্মতিক্রমেই অনুমোদিত হয়। এই কাজ শুরু হয়েছিল বিহার থেকে, এরপর পশ্চিমবঙ্গ সহ আরও ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তা কার্যকর হয়।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.