
নিপা ভাইরাস ঘিরে রাজ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্য দফতর ইতিমধ্যেই একাধিক সতর্কবার্তা জারি করেছে। বিশেষ করে বাদুড়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় ভীতি ছড়াচ্ছে। অনেক গ্রামাঞ্চলে হঠাৎ করেই খেজুর রসের চাহিদা কমে গিয়েছে, দামও পড়েছে। তবে এই আতঙ্কের ছবি বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের মাজডিহা গ্রামে একেবারেই আলাদা। মাজডিহাকে অনেকে বলেন ‘বাদুড়ের স্বর্গরাজ্য’। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বড় গাছে হাজার হাজার বাদুড়ের বাস। বছরের পর বছর ধরে মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানে রয়েছে তারা। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে বাদুড়রা যেন প্রতিবেশী। গৃহপালিত না হলেও, এই স্তন্যপায়ীরা যেন গ্রামেরই অংশ। নিপা ভাইরাস বাদুড় থেকে ছড়াতে পারে—এ কথা গ্রামবাসীরা জানেন। তবুও অযথা আতঙ্কে ভুগছেন না তাঁরা।
গ্রামের চায়ের দোকান কিংবা মোড়ে আড্ডায় প্রায়ই আলোচনা চলে—আগে মানুষ এসেছে, না আগে বাদুড়। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত, বাদুড়রা এই গ্রামেরই বাসিন্দা। তাই তাদের রক্ষা করা দায়িত্ব। বছরের পর বছর চোরাশিকারীদের হাত থেকে বাদুড়দের বাঁচিয়ে রেখেছে মাজডিহা। শুধু তাই নয়, আশপাশের কোনও গ্রাম থেকে কেউ বাদুড়কে বিরক্ত করতে এলেও প্রতিবাদ করেন এখানকার মানুষ। ফলে মাজডিহা হয়ে উঠেছে বাদুড়দের নিরাপদ আশ্রয়।
সম্প্রতি নিপা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বাদুড়ের দেহরসের সংস্পর্শ এড়ানো জরুরি। সেই পরামর্শ মেনেই চলছেন মাজডিহাবাসীরা। কিন্তু আতঙ্কের কারণে শতাব্দীপ্রাচীন সম্পর্ক ভাঙতে রাজি নন তাঁরা। গ্রামের বাসিন্দা সোমা ঘোষ বলেন, “আমরা বহু বছর একসঙ্গে থাকছি। কখনও কোনও সমস্যা হয়নি। আমরা যেমন বাদুড়দের ক্ষতি করি না, তেমনই ওরাও আমাদের ক্ষতি করে না।
নিপার ভয়ে ওদের তাড়িয়ে দিলে ওরা যাবে কোথায়?” একই কথা বললেন প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, “শুনেছি বাদুড়ের দেহরস থেকে নিপা ছড়ায়। কিন্তু তাই বলে আমরা ভয় পেয়ে নিজেদের গ্রামের বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দেব? পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে যেমন তাকে ফেলে দিই না, তেমনই বাদুড়দেরও তাড়াতে পারি না।” তবে মানুষের সঙ্গে বাদুড়ের সম্পর্ক যতই গভীর হোক, স্বাস্থ্য দফতর সাবধানতা অবলম্বনের উপর জোর দিচ্ছে।
বাঁকুড়া স্বাস্থ্য জেলার উপ-মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সজল বিশ্বাস বলেন, “বাদুড় নিপা ভাইরাসের বাহক। তাদের দেহরসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমণ হতে পারে। তাই এই সময় বাদুড়ের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা দরকার। মাজডিহা গ্রামে যেহেতু হাজার হাজার বাদুড় রয়েছে, সেখানে বাসিন্দাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।” মাজডিহার মানুষ তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতার পথেই হাঁটছেন—সহাবস্থান বজায় রেখে, কিন্তু সাবধানতা মেনেই।