India Concert Economy Boom: ‘কনসার্ট ইকোনমি', এই মুহূর্তের অন্যতম একটি বিজনেস মডিউল। পৃথিবীর নানা প্রান্তে তো বটেই, ভারতের বুকেও একাধিক জায়গায় সারা বছরের বিভিন্ন সময়ে মেগা কনসার্ট আয়োজিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশের বিখ্যাত শিল্পীরা তো বটেই, এমনকি বিদেশি তারকারাও মাঝেমধ্যেই ভারতে আসছেন মেগা কনসার্টে পারফর্ম করতে।
গত বেশ কয়েক বছর ধরে মুম্বই, কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং গোয়া সহ দেশের একাধিক মেট্রো সিটির নানা প্রান্তে বড় বাজেটের কনসার্ট আয়োজিত হচ্ছে। কিছু বিশেষ বিশেষ মরশুমে তা সংখ্যায় আরও বৃদ্ধি পায়। যেমন নতুন বছর, ক্রিসমাস বা প্রেমের মরশুম কিংবা এমনি সময়েও বিভিন্ন কনসার্টের আয়োজন করে থাকেন আয়োজকরা।
টিকিটের দামও রাখা হয় বিভিন্ন স্তরের। ন্যূনতম একটি দাম ধার্য করা হয়। তারপর সর্বাধিক একটি দামের টিকিট রাখা হয়। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লাউঞ্জ, প্ল্যাটিনাম, গোল্ড এবং সিলভার, আলাদা আলাদা লেভেলের টিকিটের দামও ভিন্ন হয়।
তাবড় তাবড় সব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা এই ধরনের মেগা কনসার্ট আয়োজনের দায়িত্বে থাকে। যেমন মেগাস্টার অরিজিৎ সিং-এর কনসার্ট দেখার জন্যও মানুষের চাহিদা তুঙ্গে। সেইরকমই আবার কয়েকদিন বাদে কলকাতায় আয়োজিত হবে বলিউড গায়িকা সুনীধি চৌহানের কনসার্ট। এছাড়াও গত বছরই ভারতে এসে পারফর্ম করে যায় বিদেশি ব্যান্ড কোল্ডপ্লে। তাছাড়া খেলার তো একাধিক ইভেন্ট আয়োজিত হয় ভারতে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমশই এই কনসার্ট দেখার হিড়িক বাড়ছে। ফলে, টিকিটও বিক্রি হচ্ছে হুহু করে। সেইসঙ্গে, বিনিয়োগ করছে কর্পোরেট স্পনসররাও। পাশাপাশি আবার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাগুলিতে তৈরি হচ্ছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ। ফলে, একদিকে যেমন ব্যাবসায়িক দিক দিয়ে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকছে, আবার অন্যদিকে গোটা ইকোনমিক স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে এই ধরনের বড় বাজেটের মেগা কনসার্টগুলি (indian concert economy growth rate chart)।
আর তাই এবার জেন জেড-এর পছন্দের সেই কনসার্ট কালচার নিয়ে রীতিমতো সিরিয়াস দেশের কেন্দ্রীয় সরকার। আধুনিক এই ডিজিটাল যুগে দেশের সরকারও এবার শক্তিশালী ‘কনসার্ট ইকোনমি' গড়ার দিকে একধাপ এগোল।
দেশের লাইভ বিনোদন শিল্পের পরিকাঠামোগত বৃদ্ধি এবং ভারতের উদীয়মান কনসার্ট অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও আরও বেশি করে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের উদ্যোগে তৈরি হল ‘লাইভ ইভেন্টস ডেভেলপমেন্ট সেল'। সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই কথা জানানো হয়েছে।
LIVE EVENTS DEVELOPMENT CELL একটি সিঙ্গেল উইন্ডো হিসেবে কাজ করবে। যাতে গোটা ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে চলতে পারে এবং দেশের মধ্যে উপযুক্ত মার্কেট পজিশনিং-এর মাধ্যম আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই সেক্টরকে যেন গোটা বিশ্বের দরবারে আরও পাওয়ারফুল হিসেবে প্রমাণ করা যায়। অর্থাৎ, মিশন ২০৩০ (indian concert economy growth)।
ভারতের এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে এই সিদ্ধান্ত কার্যত, ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন অনেকেই। এর আগে কোনও সরকারের পক্ষ থেকেই এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে এই মুহূর্তে লাইভ ইভেন্টের মার্কেট দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০২৪ সালে, এই সেক্টরের মার্কেট ভ্যালু গিয়ে পৌঁছেছে ২০,৮৬১ কোটি টাকায়। প্রায় ১৫% বৃদ্ধি।
মার্কেট অ্যানালিস্টরা মনে করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই বৃদ্ধি ১৮%-তে গিয়ে পৌঁছবে। যেভাবে দিনদিন লাইভ ইভেন্ট এবং কনসার্টের চাহিদা বাড়ছে, তাতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, মানুষ চাইছে এইরকম আরও ইভেন্ট হোক। তাই দেশের সরকারও বিষয়টাকে পেশাদার ঢঙেই দেখতে চাইছে। একটি উন্নত দেশের সরকার হিসেবে তাই ইতিবাচক মনোভাবই দেখালেন তারা।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের নির্দেশেই তৈরি হয় ‘লাইভ ইভেন্টস ডেভেলপমেন্ট সেল'। এটি আদতে একটি গভর্নিং বডি। যেটি মূলত, কেন্দ্রীয় এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি, একাধিক সংস্থার কর্তা এবং বড় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাগুলির অফিশিয়ালদের নিয়ে তৈরি করা হয়েছে (india's booming concert economy)।
সবথেকে বড় বিষয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং এই প্রোজেক্টকে উৎসাহ দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে, ‘ওয়েভস সামিটে' তিনি বলেন, এই দেশের লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে অসাধারণ পোটেনশিয়াল রয়েছে। যা গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে। এই ইন্ডাস্ট্রি আগামীতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চালকের আসনে বসাতে পারে ভারতকে। সেইসঙ্গে, তিনি ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রির কথাও আলাদাভাবে উল্লেখ করেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এই সেক্টরে। টেকনিক্যালি দেখতে গেলে, একটি সিঙ্গেল লার্জ ফরম্যাটের ইভেন্টে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫,০০০ স্কিলড এবং প্রফেশনাল মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম। এই ধরনের মেগা কনসার্টগুলিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টিকিটিং পার্টনার হিসেবে দায়িত্বে থাকে ‘বুক মাই শো'। সেই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের টায়ার-২ এবং টায়ার-৩ শহরগুলির ক্ষেত্রে ব্যবসা বৃদ্ধির পরিমাণ সবথেকে বেশি।
যেমন ফুটবল ইভেন্টের ক্ষেত্রে বিশাখাপত্তনমে ৪৯০% গ্রোথ দেখা গেছে। অন্যদিকে, শিলং-এ সেটা ২১৩% এবং গুয়াহাটিতে ১৮৮%। অর্থাৎ, গোটা দেশেই লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি বিপুল মুনাফার আঁতুড়ঘর হয়ে উঠছে। তাছাড়া এই সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনদিন।
অপরদিকে, এই ধরনের লাইভ ইভেন্টের ক্ষেত্রে ব্রডকাস্টারদের কী মতামত? ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কনসার্টে ভারতের প্রথম সারির কয়েকটি ব্রডকাস্টিং মিডিয়া হাউজকে পার্টনার হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ভারতে স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা এমনিতেই আছে। সেগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্রডকাস্ট হয়ে থাকে।
এই প্রসঙ্গে ব্রডকাস্টিং ইন্ডাস্ট্রির কর্তারা মনে করছেন, “নিঃসন্দেহে লাইভ ইভেন্ট ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ বেশ চোখে পড়ার মতো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ থাকে ২৫%, আবার কখনও সেটা কমে দাঁড়ায় ১০%-তে। তাই প্রথমেই টার্গেট ভিউয়ারশিপের দিকে আমাদের নজর রাখতে হয়। গড়ে ১৫% লাভের কথা মাথায় থাকে সবসময়। সেইসঙ্গে, বিজ্ঞাপনদাতাদেরও তরফেও একটা চাপ থাকে। তাই অবশ্যই আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রির দিকে নজর রয়েছে। মার্কেটের চাহিদা বুঝেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
তবে দেশের সরকার কিন্তু ইতিমধ্যেই মাঠে নেমে পড়েছে। ‘লাইভ ইভেন্টস ডেভেলপমেন্ট সেল'-এর প্রাথমিক লক্ষ্য হল, এই সেক্টরে আরও বেশি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যবসায়িক বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারতকে গ্লোবাল লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির লিডার হিসেবে গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। অর্থাৎ, এই ইকোনমিক বুমকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে চাইছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।