
আজকাল প্রত্যেক বাবা-মায়ের কাছেই সন্তানের স্কুলের ফি একটা বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পড়াশোনার খরচ। অভিভাবকদের শুধু স্কুলের টিউশন ফি দিলেই হয় না, বই, ইউনিফর্ম, যাতায়াত, স্কুল ট্রিপ, খেলাধুলো এবং স্কুলের অন্যান্য সুবিধার জন্যও মোটা টাকা খরচ করতে হয়।
বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, তখন এই খরচগুলো সামলানো সহজ মনে হলেও, বছর গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। এর পেছনে মূল কারণ হলো 'এডুকেশন ইনফ্লেশন' (Education Inflation) বা শিক্ষার মূল্যবৃদ্ধি। ধরা যাক, একটি পরিবার সন্তানের পড়াশোনার জন্য বছরে ২ লক্ষ টাকা খরচ করে। যদি প্রতি বছর ৮% হারে এই খরচ বাড়ে, তাহলে ১০ বছর পর তাদের এর দ্বিগুণেরও বেশি টাকা জোগাড় রাখতে হবে।
তাই সন্তানের শিক্ষার জন্য শুধু মাসিক বেতনের উপর ভরসা না করে, অভিভাবকদের অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে বিনিয়োগ বা সঞ্চয় শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
ধরে নেওয়া যাক, আজ আপনার সন্তানের পড়াশোনার মোট বার্ষিক খরচ ২ লক্ষ টাকা। এই খরচ যদি প্রতি বছর ৮% হারে বাড়তে থাকে, তাহলে:
অর্থাৎ, যে খরচটা আজ বছরে ২ লক্ষ টাকা, এক দশক পর (১০ বছর) সেটাই বছরে ৪.৩২ লক্ষ টাকার বেশি হয়ে যাবে। তাই অভিভাবকদের শুধু আজকের ফি-এর উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা উচিত নয়।
এই হিসেবটি কম্পাউন্ডিং ইনফ্লেশন (Compounding Inflation) বা চক্রবৃদ্ধি মূল্যবৃদ্ধির সূত্র দিয়ে করা হয়।
প্রথম কয়েক বছর এই বৃদ্ধি খুব বেশি মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু প্রতি বছর আগের বছরের বাড়তি খরচের উপর ৮% যোগ হওয়ায়, সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই ব্যবধান বিশাল হয়ে ওঠে। যেমন, ২ লক্ষ টাকার উপর ৮% মানে ১৬,০০০ টাকা বৃদ্ধি। কিন্তু মোট খরচ যখন ৪ লক্ষ টাকায় পৌঁছবে, তখন ৮% বৃদ্ধি মানে এক বছরেই ৩২,০০০ টাকা বেড়ে যাওয়া!
সন্তানের পড়াশোনার আসল খরচ শুধু স্কুলের ফি-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানির দাম বাড়লে স্কুল বাসের খরচও বাড়ে। বাচ্চারা উঁচু ক্লাসে উঠলে কোচিং ক্লাস, খেলাধুলো, অন্যান্য স্কিল ট্রেনিং এবং অতিরিক্ত শিক্ষামূলক প্রোগ্রামের জন্যও অভিভাবকদের টাকা খরচ করতে হয়। তাই যে পরিবার আজ ২ লক্ষ টাকা খরচ করছে, ১০ বছর পর তাদের ৪.৩২ লক্ষ টাকারও বেশি লাগতে পারে। এখানে ৮% মূল্যবৃদ্ধিকে উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়েছে। স্কুলের ধরন, শহর এবং শিক্ষার মানের উপর নির্ভর করে এই হার কম বা বেশি হতে পারে।
অভিভাবকদের ভবিষ্যতের পুরো টাকাটা একবারে জোগাড় করতে হবে না। ধাপে ধাপে একটি এডুকেশন ফান্ড (Education Fund) তৈরি করলে আর্থিক চাপ কমে যায়। সন্তানের উচ্চশিক্ষা বা কলেজে ভর্তির যখন এখনও কয়েক বছর বাকি, তখন থেকেই ভবিষ্যতের আনুমানিক খরচ হিসেব করে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করা শুরু করতে পারেন। হাতে যত বেশি সময় থাকবে, আপনার টাকা বাড়ার সুযোগও তত বেশি পাবে। প্রতি বছর পড়াশোনার খরচের লক্ষ্য পর্যালোচনা করা ভালো। যদি স্কুলের ফি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে মাসিক সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়াতে হতে পারে।
স্কুলের পড়াশোনা তো শিক্ষাজীবনের একটা অংশ মাত্র। কলেজ শিক্ষার খরচ, বিশেষ করে প্রফেশনাল কোর্স (ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি ইত্যাদি) বা বিদেশে পড়ার খরচ আরও অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, যে কোর্সের জন্য আজ ১০ লক্ষ টাকা খরচ হয়, ৮% বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হিসেবে ১০ বছর পর তার জন্য প্রায় ২১.৫৯ লক্ষ টাকা প্রয়োজন হবে!