
'এই নে তোর প্র্যাক্টিকাল খাতা। যা লিখেছিস, পড়তে গিয়ে চোখ বেঁকে গেছে....'
'ধন্যবাদ বলে কি ধন্য থেকে বাদ করতে হবে?' হ্যাঁ, এটাই ছিল অরুণোদয়ের পেটেন্ট নেওয়া সংলাপ। যখনই ওর খাতা লিখে দিতাম, এটাই ছিল ওর রেসপন্স। এই সংলাপের উত্তরে আমিও সিনেমার ডায়ালগ ঝেড়ে দিতাম একখানা, 'দোস্তি মে নো সরি, নো থ্যাঙ্ক ইউ...'
ছাইরঙা প্যান্ট আর সাদা শার্টের বাঁ দিকের পকেটে গাঢ় নীল রঙে মনোগ্রাম করা NHS, এটাই ছিল আমাদের স্কুলের পোশাক। আমি আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগেকার কথা লিখছি। ক্লাস ফাইভে নাকতলা হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বছর দুয়েক বাদে একই সেকশনে আমরা দু'জনে এক সঙ্গে বসতে শুরু করি। সেটা বজায় ছিল স্কুল পাশ করে বেরিয়ে যাওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত। অরুণের হাতের লেখা যাকে বলে একেবারে আরশোলার পায়ে কালি লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়ার মতো। পড়তে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হতো। আমি ইয়ার্কি মেরে মাঝে মাঝে বলতাম, এত কষ্ট করে হিব্রু লিখিস কেন, বাংলা লিখলেই তো পারিস। কোথাও আমাদের দুজনের ওয়েভলেন্থ ম্যাচ করে গিয়েছিল। দারুণ বাংলা লিখত। আমরা হদ্দ বাংলা মিডিয়ামের হাফসোল খাওয়া কলোনির ছেলে। ভালো লিখতে পারলেও, কোথাও ইংরেজি বলতে হবে মনে হলেই পেট খালি, মাথা বনবন। সেই তুলনায় অরুণ অনেক সপ্রতিভ ছিল। তবে বাংলা মিডিয়ামে পড়তাম বলে আমাদের হীনমন্যতা গ্রাস করেনি কখনও। বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করেছি। আমার লেখার হাতও বেশ ভালো ছিল। গান করতাম বেশ ভালো, প্রাইজও পেয়েছি। ক্রিকেট খেলছি স্কুল টিমের হয়ে। সব মিলিয়ে প্রথম-দ্বিতীয় না হলেও আমরা দুজনে শিক্ষকদের অকৃপণ ভালোবাসা আর প্রশ্রয় পেয়েছি। অরুণ প্রায় প্রত্যেক বছর নিয়ম করে স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবসে হাজির হতো। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই যেত। আমি মাত্র একবার যেতে পেরেছিলাম। শিফ্টের চক্করে মনেই থাকত না ১৬ জানুয়ারি তারিখটা। একদিন পরে অরুণের পোস্ট দেখে খেয়াল হতো। এই যাঃ, এবারও মিস করে ফেললাম। স্কুল নিয়ে অরুণের আলাদা আবেগ ছিল।
অরুণ অনেক ছোট থেকেই অভিনয় করত। মাধ্যমিকের বছরে মুক্তি পেল মিঠুন চক্রবর্তী, দেবশ্রী রায় অভিনীত 'চাকা' সিনেমাটি। তাতে রাহুলের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল। যথারীতি ছবি মুক্তির পর খবরের কাগজ এবং তৎকালীন যতটুকু মিডিয়ার এক্সপোজার ছিল তাতে অরুণ বেশ সেলিব্রিটি হয়ে গিয়েছিল। তার পর থেকে আমরা যখন জুটি বেঁধে কোথাও ক্যুইজ বা ডিবেটে অংশ নিয়েছি, মেয়েদের নিরলস মনোযোগ আমরা পেতাম। মোদ্দা কথা যোলো বছর বয়সে এতটা মনোযোগ পাব তা কোনও দিন আশাই করিনি। অরুণ কানের কাছে মুখ এনে বলত, 'এই তো সবে শুরু ভাই, আগে আগে দেখো হোতা হ্যায় কেয়া...' আমরা আমাদের জীবনের সেরা সময় স্কুলে কাটিয়েছি। অন্তত আমাদের গ্রুপের যারা যারা ছিল তারা নিঃসন্দেহে আমার সঙ্গে একমত হবে। স্কুল পাশ করে যে যার পথে বেরিয়ে পড়েছিলাম। হ্যাঁ, অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই, স্কুলের সেই নির্ভেজাল স্বার্থবিহীন বন্ধুত্বে খানিক ধুলো জমেছিল।
২০০৮ সাল। আমি তখন চাকরি করছি। সে বছর অন্যতম সেরা হিট ছবি 'চিরদিনই তুমি যে আমার' মুক্তি পায়। অরুণ তখন রাতারাতি রাহুল হয়ে জনমানসে জাঁকিয়ে বসেছে। ছবির গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। অনুষ্ঠানে তখন গান বাজছে, পাড়ায় পাড়ায় ফাংশনে শিল্পীরা গাইছেন। বলতে খানিক লজ্জা করত, রাহুল আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে একই বেঞ্চে বসতাম। ভাগ করে টিফিন খেতাম। ওর খাতা লিখে দিতাম। কে জানে মানুষ কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে। হয়তো বলবে, যেই সেলিব্রিটি হয়েছে অমনি স্তাবকের মতো হাজির হয়েছে। ওরকম অনেক বন্ধু থাকে। জানি না কেন, তখন বন্ধুত্বের ভ্যালিডেশন খুঁজতাম। মানে সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে কী ট্যারা ট্যারা কথা বলবে সেই ভয়ে স্বীকার করতেও লজ্জা হতো। এখন মধ্য চল্লিশের কাছাকাছি এসে বুঝি, সেটা কত বড় ভুল ছিল। মানুষ বাকি সকলকে মিথ্যে বলতে পারে, কিন্তু নিজেকে বলতে পারে কি? আর কী হবে মিথ্যে বলে?
ধীরে ধীরে পথ আলাদা হয়েছে। আমি চাকরি নিয়ে শহরের বাইরে। অরুণ তখন চুটিয়ে সিরিয়াল সিনেমায় অভিনয় করছে। বেশ নাম-ডাক। তখন খড়্গপুরে চাকরি করি। একবার স্থানীয় কয়েকজনের সামনে বলে ফেলেছিলাম আমাদের বন্ধুত্বের কথা। বিশ্বাস করুন, তার পর থেকে আমায় অন্য সম্মানের চোখে দেখতেন ওরা। তখন আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন কথাবার্তা নেই। ওর মোবাইল নম্বরও জানি না। কিন্তু তাও কেন জানি না, বেশ ভালো লাগত। আমি নায়কের বন্ধু!
ঘটনাচক্রে পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় আসা এবং বহু বিনোদন জগতের ইভেন্টে অরুণের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরেছে। পরিচয় দিতে দ্বিধা করেনি। কলোনির ছেলের পা মাটিতেই ছিল। আপনারা অনেকেই ভাবছেন, কলোনির ছেলে কথাটা বারবার উল্লেখ করছি কেন। এটা ছিল অরুণের জেদ আর গর্বের জায়গা। যেমন ছিল বাংলা ভাষা। তৎকালীন সমাজে কলোনির ছেলে মানে মুখে খিস্তি, রাফিয়ান, বখাটে, মান-সম্মানে অনেক নীচে ভাবা হতো। বিশেষত যারা একটু সম্ভ্রান্ত এলাকায় থাকতেন তারা আমাদের দিকে করুণা আর তিচ্ছিল্যের দৃষ্টি দিয়ে কথা বলতেন। আমি এ জিনিস জীবনে বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। অরুণ বলত, 'আমরা কলোনির ছেলে হয়েও ওদের গালে এক একটা থাপ্পড়ের মতো বসে পড়ব শালা। কী বলিস!'
রুপোলি পর্দার সঙ্গে সমালোচনা, টক-ঝাল-মিষ্টি রসাল গল্প চৈত্র সেলের একটার সঙ্গে একটা ফ্রি-র মতো। অরুণের জীবনেও এমন একটা অধ্যায় এসেছে। কিন্তু আমি সে সব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত নই। তখনও ভাবিনি, এখনও ভাবিনা। আমি যে অরুণকে চিনি, তার পর অন্য লোকের কাছ থেকে ভ্যালিডেশনের কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। যতদূর মনে হয় ২০১৭ সাল হবে। হইচই অ্যাপ লঞ্চ অনুষ্ঠআন কভার করতে গিয়েছিলাম। সেখানে অরুণের সঙ্গে দেখা। সহজ তখন একেবারে ছোট। ওকে বলেছিলাম, 'ছেলের নামটা একেবারে মনের মতো হয়েছে। এর চেয়ে সহজ আর আনকমন নাম এখনকার দিনে দেওয়া যেত না।' এখনকার বাচ্চাদের নামে 'আংশ'-এর ছড়াছড়ি নিয়ে বেশ কিছু ক্ষণ খিল্লি করেছিলাম দুজনে। আমি তখনও পিতৃত্বের স্বাদ পাইনি। সবটা না বুঝলেও এটা বুঝেছিলাম, ছেলেকে ও ইঁদুর দৌড়ের মধ্যে মানুষ করতে চায় না। এটা ওর কাছ থেকে একটা বড় শিক্ষা ছিল। সহজের জন্যই প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে ওর সম্পর্ক নতুন ভাবে ফিরে এসেছিল। অরুণ যদি ছেলেকে সঠিক শিক্ষা না দিত, তবে এটা সম্ভব হত না। অরুণের চলে যাওরা পরে সবচেয়ে বেশি যার মুখ মনে পড়ছে সে সহজ-ই। কারণ আমি আজ বাবা হয়েছি। জানি স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যেতে কত কষ্ট হতে পারে। ভাই তোর এত তাড়া ছিল? জানি না ঈশ্বরের এ কেমন ইচ্ছে। যাইহোক, ঝাপসা চোখে লেখা শেষ করার আগে একটা কথা বলছি, ছাইরঙা প্যান্ট আর সাদা শার্টের বাঁ দিকের পকেটে গাঢ় নীল রঙে মনোগ্রাম করা NHS লেখা স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে আবার স্কুলের মাঠে হাজির হব। অনেকদিন ধুলো মাখা হয়নি। আসিস কিন্তু। আবার দেখা হবে বন্ধু! আবার দেখা হবে...
Entertainment News ( বাংলা বিনোদনের খবর ): Read Entertainment News including movie reviews, Trailers, Celebrity gossips, TV shows and other Entertainment News in at Asianet News Bangla.