
মনে পড়ে নব্বইয়ের দশকের সেই দিনগুলোর কথা? দূরদর্শনে 'দ্য জাঙ্গল বুক' শুরু হলেই গোটা ঘর একদম শান্ত হয়ে যেত। নব্বইয়ের দশকের বাচ্চাদের কাছে মোগলির জঙ্গল মানেই ছিল একরাশ প্রিয় চরিত্র। ভাল্লুক বালু, বাঘিরা আর মোগলিকে আগলে রাখা নেকড়ের দল। কিন্তু এর মধ্যেই একটা চরিত্র ছিল, যে পর্দায় এলেই বেশ ভয় ভয় লাগত। সে হলো শের খান। আর এই হিন্দি ভার্সনে বাঘের গলায় সেই ভয়ংকর আওয়াজটা দিয়েছিলেন নানা পাটেকর।
নানা পাটেকর বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে মারা যান। 'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর' বা 'অব তক ছপ্পন'-এর মতো সিনেমায় তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়ের কথা সবাই জানেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর মিম বা ভিডিও ভাইরাল হওয়ার অনেক আগে থেকেই, তাঁর গলার আওয়াজ টিভির দর্শকদের কাছে খুব চেনা ছিল।
নব্বইয়ের দশকে 'দ্য জাঙ্গল বুক' দেখা বাচ্চাদের কাছে পাটেকরের 'শের খান' সত্যিই খুব ভয়ের ছিল। এই মানুষটাকে কিন্তু একবারও পর্দায় দেখা যায়নি। তার দরকারও পড়েনি। মোগলির দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর চরিত্রটার শুধু ডাবিং করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর কাজটা এতটাই নিখুঁত ছিল যে, শের খান আর তাঁর ওই গম্ভীর গলা—দুটোকে আলাদা করা মুশকিল।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে 'জাঙ্গল বুক: দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ মোগলি' নামে একটা জাপানি অ্যানিমেটেড সিরিজ হিন্দিতে ডাব করে দূরদর্শনে দেখানো হতো। ভারতের প্রায় সব ঘরেই এটা তখন রোজকার রুটিন। জঙ্গলে নেকড়েদের কাছে বড় হওয়া একটা বাচ্চা ছেলে মোগলিকে নিয়েই ছিল এই গল্প। এই সফরেই দর্শকদের আলাপ হয় আদুরে ভাল্লুক বালু, বুদ্ধিমান কালো চিতা বাঘিরা আর মোগলির নেকড়ে পরিবারের সঙ্গে। কিন্তু শের খান ছিল একদম আলাদা।
বাঘটা মোগলিকে নিজের বিপদ বলে মনে করত। তাই জঙ্গল থেকে তাকে তাড়াতে মরিয়া ছিল সে। শের খান পর্দায় এলেই পরিবেশটা কেমন যেন বদলে যেত। ছোট দর্শকদের কাছে সে শুধু একটা অ্যানিমেটেড চরিত্র ছিল না। সে ছিল এমন এক ভিলেন, যাকে দেখলেই ভয় লাগত।
পাটেকরের গলার আওয়াজ চরিত্রটাকে এতটা ভয়ংকর করে তোলার পেছনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। তাঁর ওই গম্ভীর গলা শের খানকে একটা আলাদা দাপট দিয়েছিল। খুব বেশি না চেঁচিয়েও, শুধু মেপে মেপে ডায়লগ বলেই তিনি চরিত্রটাকে ভয়ংকর করে তুলেছিলেন। তাঁর গলার আওয়াজে একটা চাপা রাগ লুকিয়ে থাকত। শের খান যখন খুব শান্ত হয়ে কথা বলত, তখনও মনে হতো এই বুঝি কোনো বিপদ ঘনিয়ে এল। তাঁর অভিনয়ের আসল জোর ছিল এটাই।
কোনো বড়সড় ড্রামাটিক সিন ছাড়াই, শুধু গলার আওয়াজ দিয়ে সবার নজর কাড়তে পারতেন পাটেকর। তাঁর ডায়লগ বলার স্টাইল, কোথায় থামতে হবে বা কোন শব্দে জোর দিতে হবে—এসব সিনেমার দর্শকদের কাছে আগে থেকেই খুব চেনা ছিল। আর একটা অ্যানিমেটেড চরিত্রের ক্ষেত্রেও এই স্টাইলটা দারুণ কাজ করেছিল।
নব্বইয়ের দশকের ছেলেমেয়েদের কাছে ওই গলার আওয়াজটা ছোটবেলার একটা বড় অংশ হয়ে উঠেছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই চরিত্রটার সঙ্গে পাটেকরের সম্পর্ক শুধু ওই পুরনো টিভি সিরিজের মধ্যেই আটকে থাকেনি। দু'দশকেরও বেশি সময় পর, ২০১৬ সালে রিলিজ হওয়া 'দ্য জাঙ্গল বুক' সিনেমার হিন্দি ভার্সনেও তিনি ফিরে আসেন। আবারও সেই শের খানের গলাতেই শোনা যায় তাঁকে।
ততদিনে হিন্দি সিনেমায় অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে ফেলেছেন পাটেকর। তাঁর ঝুলিতে তখন সিরিয়াস ড্রামা, অ্যাকশন সিনেমা, সামাজিক গল্পের পাশাপাশি দারুণ সব কমেডি চরিত্রও রয়েছে। তা সত্ত্বেও, শের খানের ওই গলার আওয়াজটা তাঁর কেরিয়ারের একটা সম্পূর্ণ আলাদা জায়গা দখল করে আছে। এই কাজটার জন্য তাঁর মুখ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা পর্দায় উপস্থিতির কোনো দরকার পড়েনি। পুরোটাই ছিল তাঁর গলার ম্যাজিক।
পাটেকর নিজের লম্বা কেরিয়ারে ভারতীয় দর্শকদের অনেক মনে রাখার মতো চরিত্র উপহার দিয়েছেন। কোনোটা দর্শকদের ভাবিয়েছে, কোনোটা হাসিয়েছে, আবার কোনোটা অবাক করেছে। কিন্তু একটা গোটা প্রজন্মের বাচ্চাদের কাছে তাঁর গলার আওয়াজটা খুব সাধারণ একটা কাজ করেছিল। সেটা হলো, ভয় দেখানো। আর এত বছর পরেও, 'দ্য জাঙ্গল বুক' বলতেই সবার আগে মনে পড়ে শের খানের সেই ভয়ংকর গলার আওয়াজটাই।
Entertainment News ( বাংলা বিনোদনের খবর ): Read Entertainment News including movie reviews, Trailers, Celebrity gossips, TV shows and other Entertainment News in at Asianet News Bangla.