
প্রতি ১০ বছর অন্তর গঠিত হয় কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন, আর সেই ধারাবাহিকতাতেই তৈরি হয়েছে অষ্টম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন (৮ম CPC)। বর্তমানে এই কমিশন রয়েছে পরামর্শ পর্যায়ে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে সফর করে কর্মী সংগঠন, পেনশনভোগী সংগঠন, ফেডারেশন, ইউনিয়ন এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক করছে কমিশন, যাতে সব পক্ষের মতামত ও দাবিদাওয়া বিবেচনায় নেওয়া যায়।
কমিশনের চেয়ারপার্সন পদে রয়েছেন প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাই। সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্বে আছেন প্রাক্তন আইএএস অফিসার পঙ্কজ জৈন। আর কমিশনের সদস্য হিসেবে রয়েছেন অর্থনীতির অধ্যাপক পুলক ঘোষ, যিনি প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদেরও সদস্য। এই তিনজনের নেতৃত্বেই এগোচ্ছে কমিশনের সমস্ত কার্যক্রম।
সূত্রের খবর, ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে কমিশন তার আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পেশ করতে পারে। তবে কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর, আর নিয়ম অনুযায়ী গঠনের ১৮ মাসের মধ্যে সুপারিশ জানানোর কথা— যার অর্থ, ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিল ২০২৭ নাগাদ প্রথম ঘোষণা আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রিপোর্ট জমার একেবারে শেষ সময়সীমা মে ২০২৭।
কমিশনের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষের ওপর। এর মধ্যে রয়েছেন প্রায় ৫০ লক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী এবং প্রায় ৬৫ লক্ষ পেনশনভোগী— যার মধ্যে প্রতিরক্ষা ও রেল বিভাগের কর্মী ও অবসরপ্রাপ্তরাও অন্তর্ভুক্ত।
একাধিক কর্মী ও পেনশনভোগী সংগঠন ইতিমধ্যে কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল ন্যাশনাল কাউন্সিল — জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি (NC-JCM), মহারাষ্ট্র ওল্ড পেনশন অর্গানাইজেশন এবং অল ইন্ডিয়া ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (AIDEF)। তাদের মূল দাবি— পেনশন কাঠামোর ব্যাপক পুনর্গঠন, পেমেন্টে উন্নতি এবং বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা।
পেনশনভোগী সংগঠনগুলির তরফে ন্যূনতম পেনশন বৃদ্ধির জন্য মূলত দুটি প্রস্তাব উঠে এসেছে। প্রথমত, ন্যূনতম পেনশন শেষ প্রাপ্ত বেতনের (Last Pay Drawn বা LPD) অন্তত ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হোক। দ্বিতীয়ত, চাকরির শেষ ১০ মাসের গড় বেতনের ভিত্তিতে ন্যূনতম পেনশন নির্ধারণ করা হোক।
একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বয়স্ক পেনশনভোগীদের জন্য একটি প্রগতিশীল বয়স-ভিত্তিক পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সি পেনশনভোগীদের শেষ প্রাপ্ত বেতনের (LPD) ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন দেওয়া হতে পারে। তবে এই প্রস্তাব এখনও বিবেচনাধীন, কেন্দ্রের অনুমোদন এখনও মেলেনি।
প্রস্তাব অনুযায়ী সম্ভাব্য বয়স-ভিত্তিক পেনশনের কাঠামো এরকম— ৬৫ বছর বয়সে শেষ বেতনের ৭০ শতাংশ, ৭০ বছরে ৭৫ শতাংশ, ৭৫ বছরে ৮০ শতাংশ, ৮০ বছরে ৮৫ শতাংশ, ৮৫ বছরে ৯০ শতাংশ এবং ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সে সম্পূর্ণ অর্থাৎ ১০০ শতাংশ পেনশন প্রস্তাবিত হয়েছে।
কমিশনের রেফারেন্স শর্তে (Terms of Reference বা ToR) স্পষ্টভাবে বলা নেই যে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে অবসর নেওয়া কর্মীদের পেনশনও সংশোধন করা হবে কি না। এই আশঙ্কা থেকেই ডিপার্টমেন্ট অফ পার্সোনেল অ্যান্ড ট্রেনিং (DoPT) এবং রিটায়ার্ড এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (REWA) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধিত্ব জমা দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।
মনে রাখা জরুরি, অষ্টম বেতন কমিশনের আলোচনা এখনও চলছে এবং এখনও পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি কমিশনের সুপারিশ এলেও তা কার্যকর হওয়ার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তাবের তুলনায় কতটা ভিন্ন হবে, তা এখনই বলা মুশকিল।