
ছাত্র আন্দোলন থেকে কীভাবে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটতে পারে, তা বোঝাতে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অশান্তির উদাহরণ টানল দিল্লি হাইকোর্ট। ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার হেফাজত সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ করে আদালত। বিচারপতি সুব্রহ্মণিয়ম প্রসাদ আন্দোলনকারীদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ দেখানোর চেষ্টা এবং আগের শান্তি বজায় রাখার বন্ড ভাঙার অভিযোগে CJP নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছিল। সেই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সৌরভ ও আশুতোষ।
শুনানিতে বিচারপতি বলেন, আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ব্যক্তিরা ব্যারিকেড ভাঙলে তাঁদের দেখে অন্যরাও একই কাজ করতে পারেন। সেই পরিস্থিতিতে ভিড়ের মধ্যে থাকা প্রত্যেককে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অশান্তির প্রসঙ্গ টেনে আদালত জানায়, অন্য দেশেও ছাত্র আন্দোলন থেকে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি বা অন্যান্য ভবনে আগুন লাগানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। বিচারপতি সুব্রহ্মণিয়ম প্রসাদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জোর দিয়ে বলে যে, বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য পুলিশের অনুমতির প্রয়োজনীয়তা কেবল বিক্ষোভকারীদের সীমাবদ্ধ করার জন্যই নয়, বরং অন্যদের সেখানে যোগ দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখার জন্যও।
১০ অক্টোবর দিল্লি বিমানবন্দরে CJP-র কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছিল। পরে ৫০ হাজার টাকার শান্তি বজায় রাখার বন্ড জমা দেওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পরেও ১৪ অক্টোবর জন্তর মন্তরে তিরঙ্গা আন্দোলন করার চেষ্টা করেন সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। এরপর তাঁদের গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশ। আদালতে তোলা হলে তাঁদের পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছিল। ১৯ অক্টোবর বিশেষ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁদের হেফাজতের মেয়াদ আরও দু’দিন বাড়ান। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই হাইকোর্টে আবেদন করেন তাঁরা।
শুনানিতে আদালত প্রশ্ন তোলে, শান্তি বজায় রাখার বন্ড ভাঙার অভিযোগ উঠলে প্রশাসন আরও কঠোর শর্ত আরোপ করতে পারে কি না। শুনানি চলাকালীন বিচারপতি প্রসাদ প্রশ্ন তোলেন যে, যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থল হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করা সত্ত্বেও সেখানে প্রবেশের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল। তিনি বলেন, “ব্যারিকেডগুলো কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে রাখা হয়। আপনারা যখন ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢোকেন, তখন সেখানে আরও মানুষের চলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়—এমন সব মানুষ, যারা হয়তো আপনাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।”
ফ্রান্সে চলা বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে হাইকোর্ট বলে, “আমরা আমাদের দেশের বাইরেও এমনটা ঘটতে দেখছি। যা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা পরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে রূপ নিয়েছে... ঠিক এই কারণেই পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এটি কেবল আপনাদের থামানোর জন্য নয়, বরং অন্যদের আপনাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আপনাদের সুনাম নষ্ট করা থেকে বিরত রাখার জন্যও।”
অনুমতি বাতিল হওয়া স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করাটা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার মতো যথেষ্ট গুরুতর কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালত জানায় যে, এই কাজের আইনি বৈধতা একটি আলাদা বিষয়, যা তারা খতিয়ে দেখবে। আদালত বলে, “আপনারা সেখানে গিয়ে ব্যারিকেড ভেঙেছেন। সেই বিষয়টি আমরা দেখব।”
শুনানি চলাকালীন, হাইকোর্ট সিজেপি নেতাদের বয়সও জানতে চায়। সৌরভ দাসের বয়স ২৬ বছর এবং আশুতোষ রাঙ্কার বয়স ৩১ বছর। আদালত রসিকতা করে বলে, “তাহলে তো আপনারা ‘জেন জি’ (Gen Z)-এর অন্তর্ভুক্ত নন! ‘মিলেনিয়াল’ (millennials) কোন বয়সের গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে?” আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে যে, যদিও বিক্ষোভটি শুরুতে একটি ছাত্র আন্দোলন ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে এর উদ্দেশ্য বা কারণ বদলে গেছে। বিচারপতি বলেন, “মানুষ একই থাকে, কিন্তু কারণটি বদলে যায়। পরবর্তী প্রশ্নগুলো হল আপনি কে, আপনার পরিচয় কী, আপনি কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং সেই সংগঠনের উদ্দেশ্যই বা কী? যখন শান্তি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে, তখন এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।”