
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু-হু করে বাড়ছে। এই বাড়তি খরচের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো। এর ফলে আজ থেকে ভারতে ডোমেস্টিক রান্নার গ্যাসের দাম সিলিন্ডার প্রতি ২৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে। গত তিন মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো দাম বৃদ্ধির ঘটনা। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে দিল্লিতে ১৪.২ কেজির ডোমেস্টিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯১৩ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪২ টাকা হয়েছে। এর আগে ৭ মার্চ দাম ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই আবারও জোরদার হয়েছে। কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে, তার উপর সরকারের এই পদক্ষেপ বাড়তি বোঝা চাপাল। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের তীব্র অস্থিরতার পূর্ণ প্রভাব থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম যে হারে বেড়েছে, সরকার সরাসরি তার সঙ্গেই এই মূল্যবৃদ্ধিকে যুক্ত করেছে। ভারত তার মোট ব্যবহৃত এলপিজির ৬০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। এই আমদানিকৃত গ্যাসের খরচ 'সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস'-এর সঙ্গে যুক্ত, যা প্রতি মাসে সৌদি আরামকো (Saudi Aramco) নির্ধারণ করে থাকে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা শুরুর আগে জানুয়ারি মাসে এলপিজির 'সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস' ছিল টন প্রতি প্রায় ৫২২ ডলার। হরমুজ প্রণালীর সংকটের জেরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এপ্রিল নাগাদ এই পণ্যের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক মূল্য বেড়ে টনপ্রতি ৭৭৫ ডলারে পৌঁছয়, যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছে, ১৪.২ কেজির একটি ঘরোয়া এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের খরচ এখন বেড়ে প্রায় ১,৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
দিল্লির একজন সাধারণ গ্রাহককে ৯৪২ টাকা দিতে হবে সিলিন্ডার কিনতে। কলকাতায় এই দাম দাঁড়াল ৯৬৮ টাকায়। অন্যদিকে, 'প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা'-র সুবিধাভোগীরা সিলিন্ডার প্রতি ৩০০ টাকা সরাসরি ভর্তুকি (ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার) পাওয়ার পর ৬৪২ টাকা দেবেন। সরকার জানিয়েছে, উজ্জ্বলা প্রকল্পের আওতায় ৬৪২ টাকার এই দামটি এলপিজি সিলিন্ডারের প্রকৃত আন্তর্জাতিক মূল্যের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কম। ৫ কেজি সিলিন্ডার ১০.৫০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৫৮.৫০ টাকা। আর ১০ কেজির দাম বেড়ে হয়েছে ৬৯১.৫০ টাকা।
তেল কোম্পানিগুলোর বিপুল লোকসান
কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি হল সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন সংস্থাগুলোর বর্তমান লোকসানের খুব সামান্য অংশই পুষিয়ে নিতে পারবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তেল বিপণন সংস্থাগুলো প্রতিটি ঘরোয়া এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির ক্ষেত্রে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান বহন করে চলেছে। এই আর্থিক বোঝা কিছুটা লাঘব করতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা তেল বিপণন সংস্থাগুলোর জন্য ৩০,০০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ অনুমোদন করেছে। ১০.৩৫ কোটিরও বেশি উজ্জ্বলা সুবিধাভোগীর জন্য ভর্তুকি কর্মসূচিটি অপরিবর্তিত থাকবে এবং প্রতিটি পরিবার সরাসরি সুবিধা হস্তান্তরের মাধ্যমে সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ টাকা সহায়তা পেতে থাকবে।
জ্বালানির মূল্যে সামগ্রিক চাপ
জ্বালানির সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেই এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম সব মিলিয়ে প্রতি লিটারে ৭.৫০ টাকা বেড়েছে এবং সিএনজি-র দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি প্রায় ৬ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পরেও তেল কোম্পানিগুলোকে পেট্রোল বিক্রিতে প্রতি লিটারে প্রায় ১১ টাকা এবং ডিজেল বিক্রিতে প্রতি লিটারে ৩৩.৬ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকার বরাবরই বলে আসছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের পুরো প্রভাব তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই ভোক্তাদের উপর চাপায়নি।