
El Nino Impact: প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘এল নিনো’ (El Niño) পরিস্থিতির ভয়াবহ অবস্থা জুলাই ২০২৬-এ ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় নিরক্ষীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা পরিমাপক বিশেষ সূচক নিনো ৩.৪ (Niño 3.4 Region)-এর উষ্ণতা বৃদ্ধি ভারতের কৃষিক্ষেত্র এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের ৫° উত্তর থেকে ৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং ১২০° পশ্চিম থেকে ১৭০° পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলটিকে 'নিনো ৩.৪' বলা হয়, যা এল নিনো পর্যবেক্ষণের প্রধান কেন্দ্র।তাপমাত্রা বৃদ্ধি: জুলাইয়ের শুরুতে এই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা (SST) স্বাভাবিকের চেয়ে +০.৫° সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করেছে, এমনকি কোনও কোনও সাপ্তাহিক সূচকে এটি ১.৫° থেকে ১.৬৪° সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি উষ্ণ রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং মার্কিন সংস্থা NOAA-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই উষ্ণায়ন বছরের শেষ নাগাদ আরও তীব্র রূপ নিয়ে ‘সুপার এল নিনো’-তে পরিণত হতে পারে। জুলাই মাসে ভারতে এল নিনোর প্রভাব ও বর্ষার বর্তমান চিত্রসাধারণত এল নিনো সচল থাকলে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলস্রোতের কারণে বিশ্বব্যাপী বায়ুপ্রবাহের গতিপথ বদলে যায়, যা ভারতের দিকে আর্দ্রতা ছড়ানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
এল নিনোর প্রভাবে গত জুন মাসে ভারতে প্রায় ৪৩% বৃষ্টির ঘাটতি ছিল। তবে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বর্ষা তীব্রভাবে সক্রিয় হওয়ায় ভারতের সামগ্রিক বৃষ্টির ঘাটতি কমে ১২%-এ নেমে এসেছে। আবহাওয়া দপ্তর (IMD)-এর মতে, জুলাই এবং আগস্ট মাসে ভারতে এল নিনোর প্রভাব 'দুর্বল থেকে মাঝারি' (Weak to Moderate) থাকবে।
এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের বণ্টন অসম হচ্ছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টি হলেও মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে বৃষ্টির ঘাটতির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির তীব্র বৈষম্যএল নিনোর প্রভাবে জুলাই মাসে পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রান্তের আবহাওয়ায় স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং এবং কালিম্পঙে এল নিনোর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব কম।
ভারত মহাসাগরের অনুকূল পরিস্থিতি (Positive IOD) এবং বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের জেরে উত্তরবঙ্গে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভারী বৃষ্টি হওয়ার অশঙ্কা। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ার মতো দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। মৌসুমি বায়ু দুর্বল থাকায় এখানে বৃষ্টির পরিমাণের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা ও অস্বস্তিকর আর্দ্রতা বেশি থাকছে।
বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ ও সাময়িক স্বস্তিজুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এল নিনোর তীব্রতাকে কিছুটা প্রতিহত করেছে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ ব্যবস্থা।উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে জুলাইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে দক্ষিণবঙ্গে হালকা থেকে মাঝারি বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে, যা তীব্র খরা পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে আটকে রেখেছে। তবে এল নিনো সক্রিয় থাকায় এই বৃষ্টির স্থায়িত্ব কম।
সরকারের প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসকেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এল নিনোর মোকাবিলায় বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে:জরুরি পরিকল্পনা (Contingency Plans): কম বৃষ্টিপাতপ্রবণ জেলাগুলোর জন্য জেলাভিত্তিক বিকল্প কৃষি পরিকল্পনা তৈরি রাখা হয়েছে।
কৃষকদের আবহাওয়া-ভিত্তিক চাষের পরামর্শ এবং সঠিক জল ব্যবস্থাপনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।যদিও আবহাওয়াবিদরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রতিটি এল নিনোর বছরই খরা তৈরি করে না, তবুও প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্রুত উষ্ণায়ন ভারতের আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়ার জন্য একটি বড় পরীক্ষা।