
ভারতের জাতীয় পতাকা আজ শুধু তিনটি রঙের সমন্বয় নয়, এটি দেশের স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ, শান্তি ও অগ্রগতির প্রতীক। তবে আজকের পরিচিত তেরঙ্গা একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার বদলেছে জাতীয় পতাকার নকশা ও প্রতীক। সেই দীর্ঘ যাত্রার শুরু হয়েছিল কলকাতা থেকেই।
ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯০৬ সালে কলকাতায়। স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের আবহে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে সেই পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এই পতাকাই পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় পতাকার বিবর্তনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কলকাতার সেই পতাকায় ছিল তিনটি অনুভূমিক রঙের অংশ। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দেয় এই ধারার পতাকা। ১৯০৭ সালে ম্যাডাম ভিকাজি কামা বিদেশের মাটিতে ভারতের স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে যুক্ত একটি পতাকা উত্তোলন করেন।
স্বাধীনতার আন্দোলন যত এগিয়েছে, ততই বদলেছে জাতীয় পতাকার ভাবনা। ১৯১৭ সালে অ্যানি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বাধীন হোম রুল আন্দোলনের সময় আরও একটি পতাকার নকশা সামনে আসে। এই পতাকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ভারতের স্বশাসনের দাবির প্রতিফলন ছিল। অর্থাৎ, পতাকার নকশার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছিল স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক স্বপ্নও।
এরপর আসে ১৯২১ সাল। জাতীয় পতাকার ইতিহাসে এই সময়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া এমন একটি পতাকার নকশা তৈরি করেন, যার মধ্যে ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী রঙ এবং মাঝখানে চরকা ছিল। চরকা প্রতীক হয়ে ওঠে স্বনির্ভরতার। এই নকশাই ধীরে ধীরে এমন একটি পতাকার ধারণার দিকে এগিয়ে দেয়, যার সঙ্গে আজকের তেরঙ্গার কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
১৯৩১ সালে পতাকার রঙের বিন্যাস আরও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়। গেরুয়া সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক, সাদা শান্তি ও সত্যের প্রতীক এবং সবুজ উর্বরতা ও বিকাশের প্রতীক হিসেবে জায়গা পায়। পরবর্তীতে চরকার পরিবর্তে আসে ধর্মচক্র। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বর্তমান জাতীয় পতাকার সঙ্গে পরিচিত একটি রূপ তৈরি হতে শুরু করে। স্বাধীনতার ঠিক আগে, ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই, গণপরিষদ ভারতের জাতীয় পতাকার বর্তমান নকশা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। ১৫ অগস্ট স্বাধীনতার দিনে সেই তেরঙ্গাই দেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে উত্তোলিত হয়।
বর্তমান জাতীয় পতাকায় উপর থেকে নিচে রয়েছে গেরুয়া, সাদা ও সবুজ—তিনটি সমান অনুভূমিক অংশ। সাদা অংশের মাঝখানে রয়েছে নেভি-ব্লু রঙের অশোকচক্র, যাতে ২৪টি কাঁটা রয়েছে। অশোকচক্রের নকশা নেওয়া হয়েছে সারনাথের অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র থেকে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রভাতে যে তেরঙ্গা উত্তোলিত হয়েছিল, তার একটি ঐতিহাসিক পতাকা এখনও সংরক্ষিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চেন্নাইয়ের ফোর্ট সেন্ট জর্জ মিউজিয়ামের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স গ্যালারিতে রাখা সেই পতাকাটি রেশমের তৈরি এবং তার দৈর্ঘ্য ১২ ফুট ও প্রস্থ ৮ ফুট।
আজকের তেরঙ্গার দিকে তাকালে হয়তো শুধু তিনটি রঙ ও একটি অশোকচক্রই চোখে পড়ে। কিন্তু এর প্রতিটি পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯০৬ সালের কলকাতা থেকে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রাজনৈতিক আন্দোলন ও স্বাধীন ভারতের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা তার বর্তমান রূপ পেয়েছে।
বর্তমানে Flag Code of India, 2002 জাতীয় পতাকা কীভাবে প্রদর্শন ও সংরক্ষণ করা হবে, তার নিয়ম নির্ধারণ করে। পতাকার মর্যাদা বজায় রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করার বিষয়েও এই বিধিতে নির্দেশ রয়েছে।তাই স্বাধীনতা দিবসে আকাশে যখন তেরঙ্গা উড়ে, সেটি শুধু একটি জাতীয় প্রতীক নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীন ভারতের স্বপ্নের ইতিহাস।