
নিকাশি আর কারখানার বর্জ্য মিশে নদীগুলো আজ দূষিত হচ্ছে। হায়দরাবাদের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা মুসি নদীতে কী পরিমাণ দূষিত জল বয়, তা তেলেগু মানুষেরা ভালো করেই জানেন। কিন্তু রোজ লাখ লাখ মানুষ স্নান করা সত্ত্বেও একটি ভারতীয় নদী নিজের ক্ষতিকারক জীবাণু প্রাকৃতিকভাবেই কমিয়ে ফেলে। জলের কিছু উপকারী জীবাণু ক্ষতিকারক জীবাণুগুলোকে শিকার করে মেরে ফেলে। গঙ্গা নদী এভাবেই নিজে নিজেই নিজের জল পরিষ্কার করে।
ভাইরাস বললেই আমাদের মাথায় রোগজীবাণুর কথা আসে। কিন্তু সব ভাইরাস মানুষের ক্ষতি করে না, কিছু ভাইরাস উপকারও করে। 'ব্যাকটেরিওফাজ' (Bacteriophage) হলো এমনই এক মানুষের বন্ধু। গ্রিক শব্দ 'ফাজ'-এর মানে হলো 'যা খেয়ে ফেলে'। এরা ব্যাকটেরিয়া খেয়ে বেঁচে থাকে।
এই ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার কোষ চিনে তার ওপর হামলা চালায়। এরা নিজের জিনগত উপাদান ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর ব্যাকটেরিয়ার কোষ ফেটে নতুন ফাজ বেরিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতিকে লাইটিক সাইকেল (Lytic cycle) বলেন। একটি ফাজ এভাবেই অনেক ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে পারে।
গঙ্গার জলে অনেক বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া থাকে। এর মধ্যে কিছু পরিবেশের সাধারণ জীবাণু হলেও অন্যগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর। গঙ্গার জলে থাকা ব্যাকটেরিওফাজ মূলত এদেরই টার্গেট করে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়লে ফাজ ভাইরাসের খাবার বা 'হোস্ট' বেড়ে যায়। ফাজ ভাইরাসগুলো তখন এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধ্বংস করে তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা তাই গঙ্গার ব্যাকটেরিওফাজকে একটি প্রাকৃতিক জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বলেন।
ব্যাকটেরিওফাজ সব ব্যাকটেরিয়ার ওপর একইভাবে কাজ করে না। প্রতিটি ফাজের একটি নির্দিষ্ট টার্গেট থাকে। গঙ্গার জলে প্রচুর পরিমাণে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া থাকে। বিজ্ঞানীরা একে জল দূষণের বড় লক্ষণ হিসেবে ধরেন। ফাজ ভাইরাসগুলো মূলত এদেরই টার্গেট করে আর সংখ্যায় কমিয়ে দেয়।
গঙ্গার জলের এই বিশেষ গুণ নিয়ে গবেষণা কিন্তু নতুন নয়। ব্রিটিশ ব্যাকটেরিওলজিস্ট আর্নেস্ট হ্যাংকিন ১৮৯৬ সালে গঙ্গা ও যমুনার জলে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল প্রভাব লক্ষ্য করেন। ফরাসি-কানাডিয়ান মাইক্রোবায়োলজিস্ট ফেলিক্স ডি'হেরেল পরে গঙ্গার জল নিয়ে গবেষণা করে 'ব্যাকটেরিওফাজ' সম্পর্কে জানান। গঙ্গার জলে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী এই প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ একশো বছরেরও বেশি পুরোনো।
গঙ্গার জল নিজে নিজে পরিষ্কার হওয়ার পেছনে শুধু ব্যাকটেরিওফাজই নেই। নদীর জলের স্রোত, সূর্যের আলো, অক্সিজেন, প্রাকৃতিক পলি এবং জীবাণুদের পারস্পরিক ক্রিয়াও জলের মান বদলাতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু গবেষণায় দেখেছেন যে নদীর স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে যায়। তবে দূষিত এলাকাগুলোতে মানুষের নানা কাজের ফলে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া আর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো সমস্যাও দেখা যাচ্ছে।
ব্যাকটেরিওফাজ অ্যান্টিবায়োটিকের চেয়ে একদম আলাদাভাবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া রুখতে এদের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা করছেন।
গবেষকরা গঙ্গা থেকে আলাদা করা কিছু ফাজ ল্যাবরেটরিতে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরীক্ষা করেছেন। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে গঙ্গার একটি নতুন ফাজ কাঁচা নর্দমার জলে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমাতে পারে। এর মানে এই নয় যে গঙ্গা সব নর্দমার জল একাই পরিষ্কার করে দেবে। তবে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে বর্জ্য জল পরিশোধনে ফাজ ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন।
এক কথায় বলতে গেলে..
গঙ্গার ব্যাকটেরিওফাজ ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া চিনে তাদের ধ্বংস করে। এটাই গঙ্গার নিজে নিজে পরিষ্কার হওয়ার মূল বৈজ্ঞানিক কারণ।
তবে এরা সব ভাইরাস মারে না বা রাসায়নিক দূষণ দূর করে না। তাই গঙ্গা নিজে নিজেই সব পরিষ্কার করে নেবে—এমনটা বলা বিজ্ঞানসম্মত নয়।