সৈকত-সানসেটের আড়ালে অন্য গোয়া: শিক্ষা-সংস্কৃতির যে রূপ দেখেনি পর্যটক

Published : May 13, 2026, 07:07 PM IST
Hidden Gem in South Goa A Mysterious ‘Clapping Lake’ That Bubbles to Sound in Netravali

সংক্ষিপ্ত

গোয়া মানেই বিয়ার-বিচ-পার্টি? ভুল। ৪৫০ বছরের পর্তুগিজ শাসন আর ভারতীয় শিকড় মিলে গোয়া বানিয়েছে এক ইউনিক শিক্ষা-সংস্কৃতির ল্যাব। এখানে সরকারি স্কুলে কঙ্কণি, মারাঠি, ইংরেজি তিন মাধ্যমেই পড়ানো হয়। গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স দেশসেরা। মান্ডো-দুলপদ গানে পর্তুগিজ ফাডো আর ভারতীয় রাগের ফিউশন। 

গোয়া নাম শুনলেই চোখে ভাসে কালাঙ্গুটে বিচে বিদেশি বিকিনি, তিতোস লেনের DJ নাইট, আর বোতলে ফেনি। কিন্তু বাগা বিচ থেকে ৫ কিমি ভিতরে গেলেই অন্য গোয়া।

এই গোয়ায় সকাল হয় চার্চের ঘণ্টায় আর মন্দিরের শঙ্খে। স্কুলে বাচ্চারা প্রার্থনা করে কঙ্কণিতে, টিফিনে খায় পোই-চোরিজ পাও। এখানে পিএইচডি হয় মেরিন বায়োলজিতে, আর সন্ধ্যায় রিহার্সাল হয় ৪০০ বছরের পুরনো মান্ডো গানের।

*১. শিক্ষা: পর্তুগিজ কনভেন্ট থেকে IIT ক্যাম্পাস*

গোয়ার লিটারেসি রেট ৮৮.৭%, ভারতের মধ্যে টপ ৫-এ। কারণটা ইতিহাসে। পর্তুগিজরা ১৫৪২ সালে সেন্ট পলস কলেজ বানিয়েছিল – এশিয়ার প্রথম প্রিন্টিং প্রেস ওখানেই বসে।

*স্কুল সিস্টেম:* সরকারি স্কুলে তিন মাধ্যম – কঙ্কণি, মারাঠি, ইংরেজি। কঙ্কণি দেবনাগরী হরফে পড়ানো বাধ্যতামূলক। তাই গোয়ানিজরা ৩-৪টা ভাষা অনায়াসে বলে। ক্লাস টেনের পর্তুগিজ ভাষা অপশনাল সাবজেক্ট। পাশ করলে পর্তুগালে স্কলারশিপ মেলে।

*উচ্চশিক্ষা:* ১৯৮৫ সালে তৈরি গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তালেগাঁও ক্যাম্পাস পাহাড়ের মাথায়। মেরিন সায়েন্স, আর্থ সায়েন্স, পর্তুগিজ স্টাডিজে দেশসেরা। BITS পিলানি গোয়া ক্যাম্পাস, IIT গোয়া, NIT গোয়া – তিনটেই গত ২০ বছরে এসেছে। গোয়া কলেজ অফ আর্ট ১৯৭২ থেকে ফাইন আর্টসের পীঠস্থান।

*লাইব্রেরি কালচার:* পানাজির সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ১৮৩২ সালের। ১.৮ লাখ বই, ১৬ শতকের পর্তুগিজ পুঁথিও আছে। গ্রামে গ্রামে ‘ভিলেজ পঞ্চায়েত লাইব্রেরি’ – বিকালে কাকা-জেঠুরা খবরের কাগজ পড়ে।

*২. সংস্কৃতি: ভারত-ইউরোপের ককটেল*

গোয়ার সংস্কৃতিকে বলে ‘সুসেগাদ’ – পর্তুগিজ শব্দ, মানে রিল্যাক্সড, শান্ত জীবন। কিন্তু এই রিল্যাক্সের ভিতরে ৪৫০ বছরের কালচারাল ফিউশন।

*• ভাষা ও সাহিত্য:* কঙ্কণি গোয়ার প্রাণ। বাক্য গঠন মারাঠির মতো, কিন্তু ৪০% শব্দ পর্তুগিজ। যেমন টেবিল = মেজ, জানালা = জানেল। কঙ্কণি সাহিত্যে জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন রবীন্দ্র কেলে্কার। ‘গোয়াঞ্চো সাদ’ পত্রিকা ১৯০০ সাল থেকে চলছে।

*• গান-বাজনা:*

*মান্ডো:* গোয়ার ক্লাসিক্যাল লাভ সং। পর্তুগিজ ফাডো + ভারতীয় দাদরা তাল। বিয়েতে ব্রাইড-গ্রুম নাচে। *দুলপদ:* মান্ডোর পরের ফাস্ট ভার্সন, ঠাট্টা-ইয়ার্কির গান। *ফিউগডি-ধালো:* হিন্দু মহিলাদের লোকনৃত্য, গণেশ চতুর্থীতে হয়।

*গোমাট বাদ্য:* মাটির ড্রাম, শিগমো উৎসবের জান।

*• গোয়ার উৎসব:*

গোয়া মানে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ।

*শিগমো:* গোয়ার হোলি। মার্চে রঙ, লোকনৃত্য, ভাসান। হিন্দু গ্রামে হয়।

*কার্নিভাল:* ফেব্রুয়ারিতে ৪ দিনের পর্তুগিজ লেগেসি। কিং মোমো প্যারেড, মাস্ক, স্ট্রিট ডান্স। ‘খা, পি, মজা কর’ – থিম।

*সাও জোয়াও:* ২৪ জুন। যুবকরা রঙিন মুকুট পরে কুয়োয় ঝাঁপ দেয়। সেন্ট জন ব্যাপটিস্টের জন্মদিন।

*ক্রিসমাস:* পুরনো গোয়ার চার্চে মিডনাইট মাস, বাড়িতে কুসওয়ার – ২২ রকম গোয়ান মিষ্টি।

*৩. স্থাপত্য ও খাবার: চুন-সুরকির গল্প*

*• স্থাপত্য:* ফন্টেনহাস, পানাজি – ইউনেস্কো হেরিটেজ। সরু গলি, লাল টালির ঢালু ছাদ, নীল-হলুদ-সবুজ পর্তুগিজ বারোক বাড়ি। ব্যালকনিতে ঝুলন্ত টব। পুরনো গোয়ার বম জেসাস ব্যাসিলিকায় সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের দেহ ৪০০ বছর ধরে রাখা।

*• গোয়ার খাবার:*

গোয়ান ক্যাথলিক রান্নায় ভিনিগার-পর্তুগিজ প্রভাব, হিন্দু রান্নায় নারকেল-কোকুম।

*পর্ক ভিন্দালু:* পর্তুগিজ ‘ভিনহা ডি আলহোস’ থেকে এসেছে।

*ফিশ কারি রাইস:* গোয়ার জাতীয় খাবার। কিংফিশ বা ম্যাকারেল, ত্রিফলা দিয়ে টক।

*বেবিনকা:* ১৬ স্তরের পর্তুগিজ ডেজার্ট, ৪ ঘণ্টা ধরে সেঁকে।

*ফেনি:* কাজু বা নারকেল থেকে তৈরি দেশি মদ। GI ট্যাগ পেয়েছে। স্থানীয়রা বলে, ফেনি খাওয়া নয়, কালচার।

*৪. শিল্প ও হস্তশিল্প*

*আজুলেজো টাইলস:* নীল-সাদা পর্তুগিজ টাইলস, চার্চ-বাড়ির দেওয়ালে।

*কাঠের কাজ:* রোজউডের ফার্নিচার, চার্চের পালপিট।

*কুম্ভার:* লাল মাটির হাঁড়ি-কলসি, এখনও গ্রামে বানায়।

*গোয়া কার্টুন:* মারিও মিরান্ডার কার্টুনে গোয়ান লাইফ ধরা আছে।

*আজকের চ্যালেঞ্জ:*

পর্যটনের চাপে কঙ্কণি বলা কমছে, ইংরেজি বাড়ছে। বিচ বেল্টে জমির দাম আকাশছোঁয়া, স্থানীয়রা পিছনে সরে যাচ্ছে। ফেনি বানানোর পারিবারিক ভাটি বন্ধ হচ্ছে।

তবু গোয়া লড়ছে। স্কুলে কঙ্কণি বাধ্যতামূলক করে, শিগমো-কে স্টেট ফেস্টিভ্যাল ঘোষণা করে, ফন্টেনহাসকে হেরিটেজ জোন করে কালচার বাঁচাচ্ছে।

*সর্বশেষ কথা:*

পরের বার গোয়া গেলে একদিন স্কুটি নিয়ে ভিতরের গ্রামে ঢুকুন। মাপুসা মার্কেটে কঙ্কণি শুনুন। পুরনো গোয়ার চার্চে ঘণ্টা শুনুন। সন্ধ্যায় কোনো বাড়ি থেকে মান্ডো ভেসে আসবে।

তখন বুঝবেন, গোয়া শুধু বিচ নয়, ৫০০ বছরের একটা জীবন্ত মিউজিয়াম। যেখানে ভারত আর ইউরোপ কোলাকুলি করে ‘সুসেগাদ’ হয়ে বেঁচে আছে।

PREV
Goa News in Bengali: Stay updated with Goa breaking news (গোয়া সংবাদ), political updates, tourism stories, beach news, crime news, lifestyle and viral headlines in Bangla from across the state on Asianet News Bangla.
Read more Articles on
click me!

Recommended Stories

গোয়ার আসল পোশাক ‘পানো ভাজ’ আর ‘কাস্টি’! ৪০০ বছরের পর্তুগিজ ছোঁয়া, রইল ইতিহাস