
প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC-এ ভারত ও চিনের মধ্যে উত্তেজনার আবহে সীমান্ত পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি। অরুণাচল প্রদেশে গত এক দশকে রাস্তা নির্মাণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে বছরে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হত। বর্তমানে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার হয়েছে। শুধু রাস্তা নয়, সুড়ঙ্গ, রেল, বিমান যোগাযোগ এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো উন্নয়নেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
পেমা খান্ডুর দাবি অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশে গ্রামীণ রাস্তার নেটওয়ার্ক ৪,১৩১ কিলোমিটার থেকে বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার হয়েছে। জাতীয় সড়কের দৈর্ঘ্যও ১,০৪৩ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ২,৫৩৮ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। আরও প্রায় ৪,০৬০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই সম্প্রসারণের ফলে প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ যেমন উন্নত হচ্ছে, তেমনই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সেনার যাতায়াতের সুযোগও বাড়ছে।
অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম এলাকায় রাস্তা, সেতু, সুড়ঙ্গ ও অন্যান্য কৌশলগত পরিকাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (BRO)। সংস্থাটির অধীনে রয়েছে প্রজেক্ট বরতক, অরুণাঙ্ক, ব্রহ্মাঙ্ক এবং উদয়ক। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামগুলিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি সীমান্তে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
BRO-র অন্যতম পুরনো প্রকল্প বরতক। ১৯৬০ সালে প্রজেক্ট টাস্কার নামে এর যাত্রা শুরু হয়; পরে নাম পরিবর্তন করে বরতক রাখা হয়। তাওয়াং সেক্টর-সহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় রাস্তা তৈরিতে এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অন্যদিকে, প্রজেক্ট অরুণাঙ্ক মূলত আপার সুবনসিরি, লোয়ার সুবনসিরি, কুরুং কুমে ও ক্রা দাদি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে। হাপোলি-সারলি-হুরি এবং কিমিন-পোটিনের মতো রাস্তা এই অঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রজেক্ট ব্রহ্মাঙ্ক অরুণাচলের সিয়াং, পূর্ব সিয়াং, পশ্চিম সিয়াং, আপার সিয়াং ও শি-ইয়োমি জেলায় কৌশলগত রাস্তা এবং সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছে। প্রকল্পটির অধীনে ৮১১ কিলোমিটার রাস্তা এবং প্রায় ৮৬টি সেতুর পরিকাঠামো রয়েছে। সিয়োম নালার উপর ১০০ মিটার দীর্ঘ স্টিল আর্চ ব্রিজ এবং সিমাং নালার উপর ১৬৫ মিটার দীর্ঘ সেতু উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, প্রজেক্ট উদয়ক অরুণাচলের পূর্বাঞ্চলে অঞ্জাও, লোহিত, দিবাং ভ্যালি, লংডিং, তিরাপ ও চাংলাংয়ের মতো জেলায় যোগাযোগ উন্নয়নে কাজ করে। ভারত-মায়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাতেও এই প্রকল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
অরুণাচল প্রদেশে সর্ব-আবহাওয়ায় যাতায়াতের সুবিধা বাড়াতে সেলা ও নেচিফু সুড়ঙ্গের মতো প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। নেচিফু সুড়ঙ্গের ফলে বালিপাড়া-চারদুয়ার-তাওয়াং সড়কে যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে। অন্যদিকে, সেলা সুড়ঙ্গ তাওয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়ার কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা কমাতে এই ধরনের পরিকাঠামো বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
অরুণাচল ফ্রন্টিয়ার হাইওয়ে, যার জাতীয় সড়ক নম্বর NH-913, ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সড়ক প্রকল্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১,৮২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তা অরুণাচলের পশ্চিম প্রান্তের তাওয়াং থেকে পূর্ব দিকে মায়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি চাংলাং পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। BRO, ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (NHIDCL) এবং রাজ্যের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি বিভিন্ন অংশের নির্মাণে যুক্ত। এই সড়ক প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি সীমান্তে সেনা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সীমান্তে যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা মোতায়েন, রসদ সরবরাহ এবং আহতদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। রাস্তা, সেতু, সুড়ঙ্গ ও হেলিপ্যাডের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হলে দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর সময় কমতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ে। ফলে অরুণাচল প্রদেশে পরিকাঠামো উন্নয়ন শুধু প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির জন্য নয়, সীমান্তবর্তী এলাকার সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।