
প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে যুদ্ধের বিভিন্ন লড়াইয়ের সময়কাল কমিয়ে আনছে। কিন্তু সামগ্রিক যুদ্ধের সময়কাল যে কমছে, তা নিশ্চিত নয়। আর স্থলভাগে বিজয়ই যুদ্ধের জয়ের একমাত্র অকাট্য মাপকাঠি। রবিবার এনডিটিভি ডিফেন্স সামিটে প্রথমবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমনটাই জানালেন সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠ। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের যুগেও কেন সরাসরি স্থলভাগে সেনা মোতায়েন এবং বাস্তব বিজয় গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করেন তিনি। জেনারেল শেঠ বলেন, ‘‘আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধের নানা দৃশ্য ও খবর ক্রমাগত দেখতে পাই। সেখানে তথ্যের বয়ান ও প্রচারের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্রকে অনেক সময় অস্পষ্ট করে তোলা হয়। এর ফলে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।’’
তাঁর কথায়, ‘‘এই সমস্ত কোলাহলের মধ্যেও একটি বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকে—সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে ভূখণ্ডই সর্বদা একমাত্র দৃশ্যমান ও কার্যকর উপাদান। অতীতে ভূখণ্ডের নিরিখেই বিজয় পরিমাপ করা হয়েছে, বর্তমানেও হয় এবং ভবিষ্যতেও হবে। আর সেই ভূখণ্ড দখল, সুরক্ষিত রাখা ও রক্ষা করার কাজ কেবল সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমেই সম্ভব।’’
জেনারেল শেঠের মতে, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সৈনিককে। তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই খুঁজতে হবে—এটি কীভাবে সেই সৈনিককে সহায়তা করছে, যিনি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পা রাখছেন বা যুদ্ধযান নিয়ে লড়াই করছেন? ঠিক এই কারণেই সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে আমি সেই সৈনিককেই রাখব।’’
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিলগ্নে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক ছবির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, ওই ছবিটি যুদ্ধের সমাপ্তির একটি স্পষ্ট মুহূর্তকে তুলে ধরেছিল। তবে সব সংঘাত বা শত্রুতার ক্ষেত্রে এমন নির্দিষ্ট সমাপ্তি-বিন্দু থাকে না। জেনারেল শেঠ বলেন, ‘‘সংঘাতের সময়কাল ক্রমশ অনির্দিষ্ট হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে মাঝে মাঝে তীব্র লড়াইয়ের ঘটনা ঘটছে। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে যুদ্ধের বিভিন্ন লড়াইয়ের সময়কাল কমিয়ে আনছে, কিন্তু সামগ্রিক যুদ্ধের সময়কাল যে কমছে, তা নিশ্চিত নয়।’’
বর্তমান সহস্রাব্দের যুদ্ধগুলিকে তিনি ‘বিরতিসহ যুদ্ধ’ বা ‘Wars with Pause’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, সামরিক কৌশলের একটি অংশ হয়ে উঠছে এই ‘বিরতি’। তবে এই বিরতি সংঘাতের অবসান বা কোনও পক্ষের আধিপত্যের ইঙ্গিত নয়। বরং সংঘাতের তীব্রতা এবং তার প্রকাশের ধরনে পরিবর্তনকেই এটি নির্দেশ করে।
জেনারেল শেঠের বক্তব্য, এই প্রবণতা এতটাই স্পষ্ট যে তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। আর এখানেই উঠে আসে আত্মনির্ভরতার গুরুত্ব। তাঁর মতে, কোনও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আত্মনির্ভর থাকাই হয়ে ওঠে জয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি এবং তা বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘আত্মনির্ভরতার অর্থ হল এমন সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে অন্যরা কী দিতে পারবে বা পারবে না, তার উপর নির্ভর করে আমাদের সীমাবদ্ধ থাকতে না হয়। এটি আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা অর্জনের পথগুলিকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করার একটি জোরালো কারণ।’’
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির গতির তুলনায় সামরিক সক্ষমতা অর্জনের গতি ধীর বলেও উল্লেখ করেন সেনাপ্রধান। তাঁর প্রশ্ন, যুদ্ধক্ষেত্র যখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন কীভাবে এমন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবে? তিনি বলেন, ‘‘চ্যালেঞ্জটি শুধু অন্যদের উপর নির্ভরতা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি কোনও ব্যবস্থা ব্যবহারের আগেই যেন সেকেলে বা অপ্রচলিত হয়ে না পড়ে। আমি একে ‘দেশীয় প্রযুক্তির অচল হয়ে পড়া’ বা ‘Indigenous Obsolescence’-এর একটি ফাঁদ হিসেবে দেখতে চাই।’’