
অসমের শিবসাগর জেলায় স্থানীয়রাই হয়ে উঠলেন আসল হিরো। নেপালি খুটি এলাকায় বন্যার জল হু হু করে ঢুকে পড়ায় প্রায় ৪-৫টি গ্রামের ১০০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করলেন তাঁরা। নিজেদের ঘরবাড়ি, জিনিসপত্র সব ফেলে রেখে এই স্থানীয় উদ্ধারকারীরা অন্যদের জীবন বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
উদ্ধারকারী দলের সদস্য সোহন চৌধুরী জানান, জলের স্রোত এতটাই বেশি ছিল যে নিজেদের ঘরবাড়ির কথা ভাবারও সময় পাননি তাঁরা। তিনি এএনআই-কে বলেন, "আমরা বাড়িতেই ছিলাম। হঠাৎ হু হু করে জল বাড়তে শুরু করে। নিজেদের ঘর ছেড়ে আমরা অন্যদের বাঁচাতে বেরিয়ে পড়ি। দেখি, আমাদেরই চেনা-জানা লোকেরা গভীর জলে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। নিজেদের বাড়িতে কতটা জল ঢুকেছে, তা দেখারও সময় পাইনি। ৪-৫টা গ্রাম মিলিয়ে আমরা ১০০০-এর বেশি মানুষকে বাঁচিয়েছি।"
উদ্ধার অভিযানে থাকা আরেক গ্রামবাসী কানহাইয়া চৌধুরী বলেন, তাঁরা প্রথমে ভাসমান কাঠ সংগ্রহ করতে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু জলের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজে মন দেন। তিনি বলেন, "যখন আমরা কাঠ জোগাড় করতে বেরিয়েছিলাম, তখনই দেখি জলস্তর সাংঘাতিকভাবে বেড়ে গেছে। বুঝলাম, এবার জল ঘরে ঢুকবে। সবাইকে বাড়ি ফিরে যেতে বলি, কারণ জল খুব বেড়ে গেছে। তখন কাঠ জমানোর চেয়ে পরিবারকে বাঁচানো বেশি জরুরি ছিল।" তিনি আরও যোগ করেন, "প্রথমে আমরা নিজেদের পরিবারের সদস্য আর বাচ্চাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাই। তারপর ভেবেছিলাম বাড়ির জিনিসপত্র সরাব, কিন্তু সেই সময়টুকুও পাইনি। আশপাশের লোকেরা আমাদের ডাকতে শুরু করে। নদীর ধারে পৌঁছতেই ফোন আসে, 'আমার বাচ্চাটা ওখানে আটকে আছে, প্লিজ গিয়ে বাঁচান'। তাই আমরা নিজেদের জিনিসপত্র ফেলে রেখে ওই মানুষগুলোকে বাঁচাতে চলে যাই।"
অসমের বিভিন্ন অংশে বন্যা পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের পাঁচটি জেলা বর্তমানে জলের তলায়। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলি হল গোলাঘাট, যোরহাট, শিবসাগর, চড়াইদেও এবং ধেমাজি। মোট ২১টি রাজস্ব সার্কেল এবং ৩৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ১,৩৬,২০৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১৫,৪২২ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে, যা কৃষিক্ষেত্রে বড়সড় ক্ষতি।
এই বন্যায় প্রাণহানিও ঘটেছে। শিবসাগর জেলা থেকে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া, ওই জেলাতেই দুজন এখনও নিখোঁজ। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত কোনও শহরাঞ্চলে বন্যার খবর নেই। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চলছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।
এদিকে, অসমের মন্ত্রী পীযূষ হাজারিকা শিবসাগর জেলার বন্যা কবলিত ডেমো এবং নাজিরা বিধানসভা কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। জেলা প্রশাসন কীভাবে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ চালাচ্ছে, তা তিনি খতিয়ে দেখেন।