
অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে নির্ভুল হামলা চালিয়েছিল ভারতীয় বায়ুসেনা। পাশাপাশি পাকিস্তানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় বায়ুসেনা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্টে অপারেশন সিঁদুরে ভারতের বায়ুসেনার ভূমিকার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিরীহ পর্যটক নিহত হওয়ার পর এই অভিযানের পটভূমি তৈরি হয়। ৬-৭ মে রাতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী অপারেশন সিঁদুর শুরু করে। লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে থাকা জঙ্গি ঘাঁটিগুলিকে নিষ্ক্রিয় করা।
অভিযানের শুরুতেই ভারতীয় বায়ুসেনা চিহ্নিত নয়টি জঙ্গি ঘাঁটিতে দূরপাল্লার প্রিসিশন-গাইডেড অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এর মধ্যে লস্কর-ই-তইবা এবং জইশ-ই-মহম্মদের সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষণ ও জঙ্গি পরিকাঠামো ছিল। মুরিদকে এবং বাহাওয়ালপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হামলা চালানো হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই কেন্দ্রগুলিতে জঙ্গিদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, মতাদর্শ প্রচার এবং হামলার পরিকল্পনা করা হত। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এই হামলাগুলি ছিল গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর। স্যাটেলাইট ছবি ও অন্যান্য তথ্যের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু যাচাই করার পর হামলা চালানো হয়। ভারতীয় পক্ষের দাবি অনুযায়ী, বেসামরিক বা সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়নি এবং কোনও বড় ধরনের পার্শ্বক্ষয়ক্ষতিও হয়নি।
ভারতের হামলার পর পাকিস্তান পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর চেষ্টা করে। পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং জম্মু-কাশ্মীরে ভারতীয় সামরিক স্থাপনাগুলিকে লক্ষ্য করার চেষ্টা হয়। এই হামলা মোকাবিলায় ভারতীয় বায়ুসেনার ইন্টিগ্রেটেড এয়ার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (IACCS) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিভিন্ন এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করে ড্রোন, ইউএভি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং লইটারিং মিউনিশন প্রতিহত করা হয়। স্বদেশি আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি পেচোরা এবং OSA-AK প্ল্যাটফর্মও ব্যবহার করা হয়। এর ফলে রিয়েল-টাইম সমন্বয়ের মাধ্যমে আকাশপথের হুমকি দ্রুত শনাক্ত ও মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় বায়ুসেনা পাকিস্তানের ছয়টি রাডার এবং দুটি Surface-to-Air Guided Weapon (SAGW) অবস্থান ধ্বংস করে। এর জন্য এয়ার-লঞ্চড অস্ত্রের পাশাপাশি আনম্যানড লইটারিং মিউনিশন ব্যবহার করা হয়। রিপোর্টে হামলার পরের ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ মে পাকিস্তানের চারটি গুরুত্বপূর্ণ হ্যাঙ্গারেও হামলা চালানো হয়। সেখানে যুদ্ধবিমান, AEW&C বিমান এবং UCAV রাখা ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়াকুবাবাদে কয়েকটি F-16 যুদ্ধবিমান, একটি AEW&C বিমান ও TB-2 শ্রেণির একাধিক UCAV ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাকিস্তান বায়ুসেনার বেশ কয়েকজন কর্মীর মৃত্যুর কথাও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
ভারতীয় বায়ুসেনা সরগোধা এবং রহিম ইয়ার খান বিমানঘাঁটির রানওয়েতেও হামলা চালায়। এর ফলে ওই রানওয়েগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টারগুলিকে লক্ষ্য করা হয়। চকওয়ালা এবং মুরিদে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিকাঠামোতেও হামলা চালানো হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, চকওয়ালা পাকিস্তান বায়ুসেনার এয়ার ডিফেন্স কমান্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইয়াকুবাবাদের কুলিং প্ল্যান্ট এবং রহিম ইয়ার খানের একটি টার্মিনালও হামলার লক্ষ্য ছিল।
ভারতের আকাশসীমার সামগ্রিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ভারতীয় বায়ুসেনার। অপারেশন সিঁদুরের সময় IACCS-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক নজরদারি সেন্সরকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সংস্থা একটি অভিন্ন ‘Common Recognised Air Situation Picture’ দেখতে পেরেছিল। অর্থাৎ আকাশপথে কোথায় কী ধরনের বিমান বা হুমকি রয়েছে, তার একটি সমন্বিত ছবি পাওয়া যাচ্ছিল। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাকিস্তান নিজেদের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ না করে অসামরিক বিমান চলাচল চালু রেখেছিল। সেই পরিস্থিতিতেও ভারতীয় বায়ুসেনা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালায়, যাতে কোনও অসামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
অপারেশন সিঁদুরে ভারতীয় বায়ুসেনার দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহারও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের অধীনে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, অস্ত্র, ইউএভি এবং রাডার ব্যবস্থার দেশীয় উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক অপারেশন আরও উন্নত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, অপারেশন সিঁদুর দেখিয়েছে যে ভারত জঙ্গি হামলার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, আবার একইসঙ্গে অভিযানকে নিয়ন্ত্রিত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সীমাবদ্ধও রাখতে পারে। নির্ভুল হামলা, শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স এবং তিন বাহিনীর সমন্বয়—এই তিনটি বিষয় অপারেশন সিঁদুরে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রচলিত সামরিক শক্তির সমন্বয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অপারেশন সিঁদুর সেই পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।