
৮০তম স্বাধীনতা দিবসের সকালে লালকেল্লার মঞ্চ থেকে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানেই তিনি দেশের ভবিষ্যৎ দিশা ঠিক করতে 'সপ্তশক্তি'র কথা তুলে ধরলেন। তাঁর মতে, এই সাতটি শক্তিই আগামী দিনে ভারতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এই সপ্তশক্তি হল—উৎপাদন শক্তি, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, গতি শক্তি, প্রতিরক্ষা শক্তি, সবুজ ও নীল অর্থনীতি এবং ভারতের সফট পাওয়ার।
রাজধানীর লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশের শিল্পপতিদের কাছে সরাসরি আবেদন করেন, ভারতীয় পণ্যের গুণমান যেন সবসময় বজায় রাখা হয়। এতে দেশ ও বিদেশের মানুষের ভরসা বাড়বে। মোদী বলেন, "ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু সরকারি বৃদ্ধি দিয়ে আটকে থাকলে চলবে না। প্রতিভা, ক্ষমতা এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য দিয়ে ভারত বিশ্ব নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে। আগামী দশকে ফরচুন ৫০০ তালিকায় ভারতের ৫০টি কোম্পানি থাকা উচিত। পাশাপাশি, ভারতের ব্যাঙ্ক, ফার্মা, প্রযুক্তি সংস্থা এবং ব্র্যান্ডগুলিকে বিশ্বসেরা হতে হবে।" উৎপাদন ক্ষেত্রে ডিজাইন থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ তৈরি পর্যন্ত সম্পূর্ণ দেশীয় সাপ্লাই চেন তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হল 'জিরো-ডিফেক্ট' গুণমান, কম খরচ এবং বিশ্বমানের উৎপাদন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "গত ১২ বছরে ভারত এক নতুন গতি পেয়েছে। আমরা দ্রুত এগিয়ে চলেছি। ১৪০ কোটি দেশবাসীর এই সংকল্পকে এখন আর থামানো অসম্ভব।" উৎপাদন বাড়ার ফলে দেশের প্রতিরক্ষা শক্তিও বেড়েছে। মোদী জানান, গত ১২ বছরে প্রতিরক্ষা উৎপাদন প্রায় চারগুণ বেড়েছে। একইভাবে, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন প্রায় সাতগুণ, খাদি ও গ্রামীণ শিল্পের উৎপাদন প্রায় পাঁচগুণ, আধুনিক রেল কোচের উৎপাদন ২১ গুণ এবং মোবাইল ফোন উৎপাদন ৩৩ গুণ বেড়েছে। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে বাজরা, মশলা এবং ফলের জন্য 'ফার্ম-টু-এক্সপোর্ট' সাপ্লাই চেন তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রাসায়নিকমুক্ত চাষের দিকেও এগোতে হবে।
কৃষকদের কল্যাণের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, প্রায় এক দশক আগে নেওয়া কিছু পরিকল্পনার জন্যই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে সাপ্লাই চেন ব্যাহত হলেও ভারত বিশেষ সমস্যায় পড়েনি। তিনি বলেন, "সারা বিশ্বে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০০০ টাকা, কিন্তু আমরা সেই বোঝা মানুষের ওপর চাপাইনি। সরকার সেই খরচ বহন করছে।" প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভারতকে একটি গ্লোবাল ইনোভেশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), কোয়ান্টাম, স্পেস, রোবোটিক্স এবং ভারতে তৈরি 6G প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়াই এখন লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে, বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া তরুণদের বিনামূল্যে অনলাইন কোচিং দেওয়া হবে। আগামী এক বছরে ১ কোটি তরুণকে AI-এর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, "আমরা UPI এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে আমাদের শক্তি দেখিয়েছি। এখন পরবর্তী প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তিতে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।"
গতি শক্তির অধীনে শহর, হাইওয়ে, রেল, বিমানবন্দর এবং আধুনিক সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করে একটি দ্রুত এবং বাধাহীন মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও প্রায় চারগুণ বেড়েছে। প্রতিরক্ষা শক্তির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কৌশলগত আত্মনির্ভর হওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম এবং হাইপারসনিকের মতো পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি এবং রপ্তানির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। ষষ্ঠ স্তম্ভ হল সবুজ ও নীল অর্থনীতি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রিন হাইড্রোজেন, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান তৈরির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্র, উপকূল এবং সামুদ্রিক সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। মোদী বলেন, "একটি ভুল মানসিকতার কারণে আমরা আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের ৯৯ শতাংশকে 'নো-গো এরিয়া' বানিয়ে রেখেছিলাম। আমরা ঠিক করেছিলাম এটা চলতে পারে না।" সপ্তম শক্তি হল ভারতের সফট পাওয়ার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যোগ, আয়ুর্বেদ এবং পর্যটনের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি বিশ্বে ছড়িয়েছে। এখন গেমিং, ভিএফএক্স, অ্যানিমেশন এবং ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতেও বিশ্বজুড়ে ছাপ ফেলার সময় এসেছে।