ভারতের সামনে এখন টানা কয়েক দশক দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধির দারুণ সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান এখন ঠিক কতটা মজবুত, তা বোঝাতে গিয়ে এমনটাই দাবি করলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই নিয়ে ভারতের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্রিকসের মতো মঞ্চের বিস্তার কীভাবে বিশ্ব কূটনীতিতে বড়সড় বদল আনছে, সেই বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে ভারত ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জয়শঙ্কর জানান, উদীয়মান এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলোর বৃদ্ধির গ্রাফ একেক রকম হবে। তবে ভারতের জনসংখ্যা এবং উন্নয়নের নতুন পথের কারণে, দীর্ঘমেয়াদি ও দ্রুত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারত এক্কেবারে সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে।
মিউনিখ লিডারস মিটিংয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় জয়শঙ্কর বলেন, "কিছু দেশ মাঝারি শক্তির, আবার কিছু দেশ উচ্চ-মাঝারি। এদের মধ্যে বেশ কিছু দেশের খুব দ্রুত উন্নতি করার বাস্তবসম্মত ক্ষমতা রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা হলো, আমাদের সামনে কয়েক দশকের দ্রুত বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। আর আমাদের এমন একটা জনসংখ্যা রয়েছে, যা এই বৃদ্ধিকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।"
তিনি আরও জানান, ভারতের এখন আর পুরনো আমলের শিল্পায়নের মডেল মেনে চলার দরকার নেই। বরং দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক সমাধানের দিকেই জোর দেন তিনি।
বিদেশমন্ত্রীর কথায়, "আমি তো বলব, এখনকার বিশ্ব অনেক বেশি সৃজনশীল। এখানে অনেক নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমাদের পুরনো শিল্পায়নের পথে হাঁটার কোনো দরকার নেই। আগামী দিনের জন্য আমাদের আরও আধুনিক কিছু ভাবতে হবে। মাঝারি শক্তির দেশগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ছিটকে যাবে, কেউ একই জায়গায় থাকবে, আবার কেউ হয়তো একটু পিছিয়ে পড়বে। এটাই বাস্তব। আর এভাবেই বিশ্ব ব্যবস্থা একটু একটু করে বদলাবে।"
প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর এআই নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেন। প্রযুক্তিকে কীভাবে সামাজিক সমতা এবং জনকল্যাণে কাজে লাগানো যায়, তার সেরা উদাহরণ হলো ভারত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিটেও ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গিই দেখা গিয়েছিল।
তিনি বলেন, "এআই নিয়ে আমাদের অবস্থানটা ফেব্রুয়ারির এআই ইমপ্যাক্ট সামিটেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমাদের দেশে প্রশাসন এবং সমাজে বড়সড় বদল আনতে আমরা ডিজিটাল ক্ষমতাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছি। মানুষ এখন মনে করে, এআই এমন একটা জিনিস হওয়া উচিত যা সবার হাতের নাগালে থাকবে, সস্তা হবে এবং আর্থ-সামাজিক কাজে লাগবে। এটা এককথায় মানবতার জন্য এআই। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত এমন কাজেই একে ব্যবহার করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য ঠিক এটাই।"
নতুন এই ক্ষেত্রগুলোতে সঠিক নীতি এবং সুরক্ষার কাঠামোর ওপরও জোর দেন তিনি। জয়শঙ্কর বলেন, "এর ফলে যে নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার প্রশ্নগুলো উঠছে, তা নিয়েও একটা চিন্তা রয়েছে। বিষয়টা এতটাই বড় যে, একে শুধু বাজারের ভরসায় ছেড়ে দেওয়া যায় না।"
বিশ্বজুড়ে ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চগুলোর প্রভাব কীভাবে বাড়ছে, তা নিয়েও কথা বলেন বিদেশমন্ত্রী। তিনি জানান, ব্রিকস নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এর থেকেই বোঝা যায় যে, বিশ্বের চিন্তাভাবনা বদলাচ্ছে এবং সবাই এখন আরও বেশি বৈচিত্র্যময় কূটনৈতিক সম্পর্ক চাইছে।
জয়শঙ্কর বলেন, "ব্রিকসকে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। যেমন, এর গুরুত্ব কতটা, এটা কি আদৌ কাজ করবে, এর ফলে কি কোনো বদল আসবে ইত্যাদি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি যে, হ্যাঁ, এটা কাজ করে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "এতগুলো দেশ যে ব্রিকসে যোগ দিতে চাইছে, সেটাই অনেক কিছু প্রমাণ করে। আমরা সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ করেছি, চাইলে অনায়াসেই চারগুণ করতে পারতাম। এর মানে হলো, মানুষ এখন অন্যরকম আলোচনা চাইছে। তারা চাইছে ঘরে আরও নতুন কেউ আসুক। তারা নিজেদের মতো করে কাজ করতে চায়। ব্রিকসের সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ, এই ক্রমবর্ধমান পরিসরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আরও গভীর একটা এজেন্ডা তৈরি করা।"
গত ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সামিট অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সামিটে ১১ সদস্যের সম্প্রসারিত গোষ্ঠীর নেতারা একজোট হয়েছিলেন। এবারের সামিটের থিম ছিল, 'সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ' (Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability)।
এমন একটা সময়ে ভারত এই সামিটের আয়োজন করল, যখন এই গোষ্ঠীটি ক্রমশ বড় হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং বিশ্ব প্রশাসনের মতো বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করছে। ক্রমশ বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠা সদস্যদের মধ্যে একটা ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টাও করা হয়েছে এই সামিটে।