চিনের ‘ওয়াটার বম্ব’ রুখতেই সিয়াংয়ে মেগা বাঁধের পরিকল্পনা, অথচ অরুণাচলে Gen Z-র বিক্ষোভ কেন??

Published : Oct 26, 2026, 06:29 PM IST
Siang Upper Multipurpose Project protest gen z arunachal china mega dam

সংক্ষিপ্ত

চিনের তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উজানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির উদ্যোগের পাল্টা কৌশল হিসেবে অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত সিয়াং মেগা বাঁধকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ভারত। কিন্তু এই প্রকল্প ঘিরেই স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনে সামিল হয়েছেন তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত Gen Z।

চিনের তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উজানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির উদ্যোগের পাল্টা কৌশল হিসেবে অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত সিয়াং মেগা বাঁধকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ভারত। কিন্তু এই প্রকল্প ঘিরেই স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনে সামিল হয়েছেন তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত Gen Z। গত ২৩ অক্টোবর বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (SUMP)-এর সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১১,২০০ মেগাওয়াট। জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগম বা NHPC এই প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের দায়িত্বে রয়েছে। চিনের তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশের পর এই নদীই সিয়াং নামে পরিচিত, পরে অসমে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। যা পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের আশঙ্কা, উজানে চিনের বৃহৎ বাঁধ তৈরি হলে নদীর জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বন্যা মোকাবিলা এবং দেশের জলনিরাপত্তার ক্ষেত্রে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

সিয়াং নদীতে বাঁধ কেন চায় ভারত?

সরকারের এই উদ্যোগের কারণ বুঝতে হলে সীমান্তের ওপারে তিব্বতে—অর্থাৎ নদীর উজানে—কী ঘটছে তা জানা প্রয়োজন। ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বতে ‘য়ারলুং সাংপো’ নামে পরিচিত। এটি পূর্ব দিকে প্রবাহিত হওয়ার পর দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে। এখানে এটি ‘সিয়াং’ বা ‘দিহাং’ নামে পরিচিত। সুতরাং, অত্যন্ত খাড়া ঢালবিশিষ্ট এবং উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নদীর উজানের অংশে বড় ধরনের কোনও হস্তক্ষেপ যে ভাটির দিকের অঞ্চলগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা বলাই বাহুল্য।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে চিন তাদের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের (TAR) মেডং কাউন্টিতে একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা এই বিশাল বাঁধটিকে একটি ‘ওয়াটার বম্ব’ বা ‘জল-বোমা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বেজিং এই প্রকল্পে ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার এই প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে তা হবে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

ভারত ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হল উজানের কোনও দেশ চাইলে ভাটির দিকে প্রবাহিত জলের পরিমাণ এবং তা পৌঁছানোর সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গত বছর, ভারত ‘সিন্ধু জল চুক্তি’ (Indus Waters Treaty - IWT) স্থগিত করার পর পাকিস্তান এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে চিন হয়তো সাংপো-ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

চিন যদি জল ছাড়ার ধরনে পরিবর্তন আনে, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করে বা হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ জল ছেড়ে দেয়, তবে তা ভারতের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জল নিরাপত্তার উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, নদীর প্রবাহে যে কোনও পরিবর্তনের জন্য ভারত আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে চায়—এটি তাদের একটি কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটেই উঠে আসে ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ (SUMP)-এর প্রসঙ্গ, যা নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক প্রতিবাদ চলছে। কেন্দ্রীয় সরকার সিয়াং প্রকল্পটিকে একটি সম্ভাব্য ‘বাফার’ বা সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে, যা জল ধরে রাখতে এবং ভাটির দিকে জলের প্রবাহে হঠাৎ কোনও বড় পরিবর্তন এলে তা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর তথ্য অনুযায়ী, SUMP-এর সম্ভাব্য ‘লাইভ স্টোরেজ’ (ব্যবহারযোগ্য জল ধারণক্ষমতা) প্রায় ৯.২ বিলিয়ন ঘনমিটার; তুলনায় চিনের মেডং প্রকল্পের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁধটি যদি পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ ও পরিচালনা করা হয়, তবে এটি জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং ভারতের জল নিরাপত্তা জোরদারে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া, নদীর অনিয়মিত প্রবাহকে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই জলাধারটি ভূমিকা রাখবে। এটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, ভারতের উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে, অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাবে এবং অরুণাচল প্রদেশে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে।

মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসেস-এর নভেম্বর ২০২৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে এই প্রকল্পটিকে কেবল একটি "জ্বালানি উদ্যোগ" হিসেবেই নয়, বরং ভারতের বৃহত্তর জল নিরাপত্তা ও জল-কূটনীতি কৌশলের (hydro-diplomacy strategy) অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কেন বাঁধ তৈরির বিরোধিতা করছেন স্থানীয়রা?

সিয়াং নদী স্থানীয় আদি জনগোষ্ঠীর কাছে শুধু জলের উৎস নয়, তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে—বহু মানুষের বসতভিটে ও পূর্বপুরুষের জমি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। স্থানীয় কৃষিকাজ, জীবিকা ও নদীনির্ভর জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হিমালয়ের সংবেদনশীল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় মানুষের সম্মতি নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। স্থানীয় সংগঠনগুলি প্রকল্পের প্রাক্-সমীক্ষা বন্ধ করা এবং প্রাথমিক সম্ভাব্যতা রিপোর্ট বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘আদি বানে কেবাং’ (Adi Banne Kebang) নামক স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শীর্ষ সংগঠন। তারা ‘এসইউএমপি’ (SUMP) পরিকল্পনাটি বাতিল করার এবং এর ‘প্রাক-সম্ভাব্যতা রিপোর্ট’ (Pre-Feasibility Report বা PFR) প্রত্যাখ্যান করার দাবি জানিয়েছে।

কেন আন্দোলনের নেতৃত্বে Gen Z?

কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষ্যমতে, প্রস্তাবিত এই বাঁধটি ব্রহ্মপুত্রের উজানের জলপ্রবাহের উপর চিনের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিবাদকারীরা বলছেন, এই ‘পবিত্র নদী’র উপর বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা তাঁদের পৈতৃক ভূমি, জীবিকা, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা যে ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছেন, তার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। সিয়াং প্রকল্পের বিরোধিতা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এই ধরনের বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সরব। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের অংশগ্রহণে আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ পুলিশের পদক্ষেপ এবং মহিলা বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ। ২৩ অক্টোবরের সংঘর্ষের পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়। তবে আন্দোলনের সমস্ত অংশ হিংসার পক্ষে নয়—কিছু তরুণ বিক্ষোভকারী প্রকাশ্যে হিংসার বিরোধিতাও করেছেন।

সংঘর্ষে কী ঘটেছে?

২৩ অক্টোবর অরুণাচলের সিয়াং, আপার সিয়াং এবং ইস্ট সিয়াং জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরুদ্ধে বন্‌ধ ও বিক্ষোভ হয়। ডিটে-ডিমে এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত চার মহিলা আহত হন বলে ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। পাশাপাশি পাসিঘাট এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। NHPC-র অফিস, পুলিশ স্টেশন এবং কয়েক জন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার পর কেন্দ্রীয় সরকার অরুণাচল প্রদেশে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (CRPF) র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (RAF) দুটি কোম্পানি—অর্থাৎ প্রায় ২৫০ জন সদস্যকে—মোতায়েন করেছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি হয়ে গিয়েছে?

না। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু জানিয়েছেন, বাঁধ নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। প্রথমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে প্রকল্প উপযুক্ত না হলে সরকার সেই পর্যায়ের পর এগোবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করার বিষয়ও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে চিনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে সম্ভাব্য কৌশলগত ও জলনিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা, অন্যদিকে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা। সিয়াং বাঁধ নিয়ে বিতর্কে শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর।

PREV
Read more Articles on
click me!

Recommended Stories

২.১২ লক্ষ কোটি টাকার প্রতিরক্ষা প্রস্তাবে ছাড়পত্র, সেনার জন্য আসছে ড্রোন, হেলিকপ্টার ও আধুনিক অস্ত্র
Bank Holidays: চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ৪ দিন বন্ধ থাকবে ব্যাঙ্ক, নির্দেশ জারি করল RBI