
Supreme Court Internet Ruling: সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করা শিশুদেরও মৌলিক অধিকার। পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা চাপালে তারা অনলাইনে আরও বেশি বিপদের মুখে পড়তে পারে। তবে এই অধিকারের মানে এই নয় যে, সরকার ক্ষতিকর কনটেন্ট আটকাতে বয়স অনুযায়ী কোনও সুরক্ষা বা নিয়মকানুন চাপাতে পারবে না।
১৫ অক্টোবর বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ ১৩৭ পাতার একটি নির্দেশে জানায়, ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) এবং ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদের (বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) অধীনে পড়ে।
জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স নামে একটি এনজিওর দায়ের করা পিটিশনের ভিত্তিতে এই রায় এসেছে। তারা মূলত সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন শোষণ ও নির্যাতনের ছবি-ভিডিও (CSEAM) ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
শিশুদের অধিকারের কথা বলার পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে একটি জাতীয় ডেটাবেস তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে নাবালকদের আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও দ্রুত শনাক্ত করে মুছে ফেলা সম্ভব হবে।
বেঞ্চ জানিয়েছে, ইন্টারনেট এখন আইডিয়া শেয়ার করা, সৃজনশীলতা প্রকাশ এবং তথ্য জানার একটা বড় জায়গা হয়ে উঠেছে। এর আসল দাম শুধু অনলাইনে থাকা তথ্যের মধ্যে আটকে নেই, বরং ছোট-বড় সবার কাছে এর পৌঁছানোর সুযোগটাই আসল।
পুরনো কিছু রায়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আদালত বলে, বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে শুধু কথা বলা বা মতামত দেওয়াই নয়। এর মধ্যে কিছু জানা, তথ্য পাওয়া এবং আইডিয়া শেয়ার করার অধিকারও পড়ে।
বিচারপতিরা বলেন, বয়স যাই হোক না কেন, শিশুরাও এই অধিকারগুলো ভোগ করে। তাদের ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার মানে হলো তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করা।
এই রায়ের মাধ্যমে শিশুদেরও তথ্য জানার অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হলো। তবে এর মানে এই নয় যে, ইন্টারনেটের সব সার্ভিস বিনা বাধায় সব শিশুর জন্য খুলে দিতে হবে।
বরং আদালত একটা মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি, শিশুদের নির্দিষ্ট বিপদ থেকে বাঁচাতে কীভাবে এই অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, তার মধ্যে একটা স্পষ্ট পার্থক্য টেনেছে।
একদমই তা নয়। সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, এই রায়ের মানে এই নয় যে শিশুদের অনলাইনে সুরক্ষিত রাখতে বয়স-ভিত্তিক বিধিনিষেধ বা অন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
বেঞ্চ মেনে নিয়েছে যে, শিশুরা অনলাইনে কী দেখছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে সুরক্ষাকবচ দরকার। আদালত বলেছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং নীতিনির্ধারকরা শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সম্মতি, গাইডেন্স এবং নজরদারির বিষয়গুলো আরও কড়াকড়ি করতে পারে।
আদালত শিশুদের অ্যাকাউন্টের জন্য একটি আলাদা 'চাইল্ড মোড' চালুর কথাও বলেছে। এই ধরনের সিস্টেমে তাদের প্রয়োজন এবং ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে আলাদা সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে পারে।
বিচারপতিরা জোর দিয়ে বলেন, শিশুদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া ব্যবস্থাগুলো যেন যুক্তিসঙ্গত হয়। অ্যাডাল্ট ওয়েবসাইট বা নাবালকদের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনও কনটেন্ট বা সার্ভিসে সরকার চাইলে নিষেধাজ্ঞা চাপাতেই পারে, এই রায় তাতে বাধা দিচ্ছে না।
আসল কথা হলো, শিশুদের রক্ষা করার অজুহাতে তাদের পুরো ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। বিধিনিষেধগুলো এমন হওয়া উচিত যা নির্দিষ্ট ঝুঁকিগুলো আটকাবে, কিন্তু শিশুদের অধিকারে অকারণে হস্তক্ষেপ করবে না।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে, শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা চাপালে কি তারা সত্যিই সুরক্ষিত থাকবে? আদালত বলেছে, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, শুধু ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখলেই শিশুরা বেশি সুরক্ষিত থাকে।
বেঞ্চ আরও সতর্ক করেছে যে, আইনি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারে। তখন তারা হয়তো এমন সব প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইটে চলে যাবে, যেখানে কোনও নিয়মকানুন নেই এবং যা আরও বেশি বিপজ্জনক।
এই ধরনের কড়া নিষেধাজ্ঞার ফলে শিশুরা অনলাইনে কোনও হুমকি বা শোষণের শিকার হলে বাবা-মা বা বিশ্বাসযোগ্য কাউকে জানাতে ভয় পাবে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য শাস্তির ভয়ে একটি শিশু হয়তো তাকে ব্ল্যাকমেইল করা বা যৌন শোষণের কথা চেপে যাবে। আদালত বলেছে, এর ফলে পকসো (POCSO) আইনের মতো শিশুদের সুরক্ষার জন্য তৈরি আইনগুলোর আসল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বিচারপতিরা আরও বলেন, ঢালাও বয়সের বিধিনিষেধ কার্যকর করতে গেলে প্রতিটি ইউজারের বয়স যাচাই করতে হবে। এর জন্য সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং তার ওপর নজরদারি চালাতে হবে।
আদালতের মতে, এই প্রক্রিয়াগুলো নজরদারি, ডেটার অপব্যবহার এবং গোপনীয়তার অধিকারে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই শিশুদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের নিয়ম তৈরির সময় সরকারগুলোকে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।
আদালতের যুক্তি এটা নয় যে সব বিধিনিষেধই অকেজো, বরং ঢালাও নিষেধাজ্ঞা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে এবং এটি কোনও নির্ভরযোগ্য সমাধান নয়।
বেঞ্চ জোর দিয়ে বলেছে যে, ইন্টারনেট শুধু বিনোদন বা সোশ্যাল মিডিয়ার জায়গা নয়। অনেক শিশুর কাছেই এটি পড়াশোনা, তথ্য জানা এবং সামাজিক যোগাযোগের একটা বড় মাধ্যম।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা শিশুরা অনেক সময়ই পড়াশোনার জন্য অনলাইনের ওপর নির্ভর করে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদেরও তথ্য পেতে, সমমনা মানুষদের সঙ্গে জুড়তে এবং এমন সব কমিউনিটির সঙ্গে মিশতে সাহায্য করে, যা হয়তো অফলাইনে সম্ভব নয়।
পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা চাপালে অনলাইন ঝুঁকির পাশাপাশি এই সুযোগগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে।
আদালত বলেছে, শিশুদের তাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার মধ্যে কোনও একটাকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। দুটোই সমান জরুরি, তাই সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলো এমন হওয়া উচিত যা দুটো দিকই বজায় রাখে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি সরকার, প্রযুক্তি কোম্পানি, পুলিশ, বাবা-মা এবং অন্য সব স্টেকহোল্ডারদের ওপর দায়িত্ব চাপায়, যাতে তারা শুধু শিশুদের ইন্টারনেট থেকে দূরে না রেখে অনলাইন দুনিয়াকে আরও সুরক্ষিত করে তোলে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের যৌন শোষণ এবং নির্যাতনের ছবি-ভিডিও (CSEAM) ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও এই মামলার অন্যতম ফোকাস ছিল। সুপ্রিম কোর্ট এই ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এগুলো দ্রুত শনাক্ত করে মুছে ফেলার জন্য আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে।
আদালত বলেছে, শুধু শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখলেই এই ধরনের কনটেন্ট ছড়ানো বন্ধ হবে না। সঠিক সুরক্ষাকবচ এবং সবার আন্তরিক চেষ্টা ছাড়া এই ধরনের কনটেন্ট ছড়াতেই থাকবে এবং যারা এগুলো খোঁজে তারা আরও উৎসাহ পাবে।
নির্দেশিকার অংশ হিসেবে, বেঞ্চ কেন্দ্রকে একটি জাতীয় ডেটাবেস তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। এর মাধ্যমে নাবালকদের আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও দ্রুত শনাক্ত করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হবে।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিকর কনটেন্টগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া, এটা ধরে নেওয়া নয় যে শিশুদের ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, পুলিশ, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বেআইনি কনটেন্ট তৈরি, ছড়ানো এবং সহজলভ্য হওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সবারই ভূমিকা রয়েছে।
এই নির্দেশ এটাও স্পষ্ট করে যে, অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষা শুধু একটা পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে পারে না। সুরক্ষাকবচ, শনাক্তকরণ সিস্টেম এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এই রায়ের মানে এই নয় যে শিশুরা ইন্টারনেটের সব ওয়েবসাইট বা সার্ভিসে বিনা বাধায় ঢুকতে পারবে। বরং এটি স্পষ্ট করে যে, শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধা দেওয়ার আগে তাদের সাংবিধানিক অধিকার, ঝুঁকির মাত্রা এবং সেই পদক্ষেপ কতটা কাজে আসবে, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
সরকার এখনও ক্ষতিকর কনটেন্ট আটকাতে পারে এবং বয়স অনুযায়ী সুরক্ষার কথা ভাবতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকেও শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বয়স যাচাই বা অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণের সিস্টেমগুলো যেন গোপনীয়তার অধিকারে হস্তক্ষেপ না করে।
শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় বাবা-মা এবং অভিভাবকদের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আদালতের যুক্তি অনুযায়ী, এই দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তি কোম্পানি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পুলিশকেও অপব্যবহার রুখতে এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় একটা পরিষ্কার পার্থক্য টেনেছে—ইন্টারনেট ব্যবহার করা শিশুদের মৌলিক অধিকার, কিন্তু তার মানে এই নয় যে যুক্তিসঙ্গত সুরক্ষার দরকার নেই। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, ঢালাও নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে অনলাইন দুনিয়াকে আরও সুরক্ষিত করে তোলা। কারণ ঢালাও নিষেধাজ্ঞা তথ্য ও শিক্ষার সুযোগ কেড়ে নিতে পারে এবং কিছু শিশুকে ইন্টারনেটের আরও বিপজ্জনক ও অনিয়ন্ত্রিত দিকে ঠেলে দিতে পারে।