
পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দেশের চারটি বড় প্রদেশকে ভেঙে ছোট ছোট প্রশাসনিক এলাকা তৈরির পক্ষে। বর্তমানে পাকিস্তান চারটি প্রধান প্রদেশে বিভক্ত। সেগুলি হল—পাঞ্জাব: পাকিস্তানের সর্বাধিক জনবহুল প্রদেশ। সিন্ধ: পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটি। খাইবার পাখতুনখোয়া: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল PTI-এর রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এই প্রদেশে। বালুচিস্তান: আয়তনে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী অশান্তি রয়েছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এখন এই বড় প্রদেশগুলোকে ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত করতে চাইছেন। এর ফলে ১২ থেকে ১৫টি নতুন প্রদেশ কিংবা ১৬০টি পর্যন্ত ছোট অঞ্চল তৈরি হতে পারে।
এই প্রদেশগুলি আয়তন, জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক চাহিদার নিরিখে একে অপরের থেকে অনেকটাই আলাদা। বিশেষ করে পাঞ্জাবের বিপুল জনসংখ্যার কারণে প্রশাসনিক পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট প্রদেশ তৈরি হলে প্রশাসনিক কাজকর্ম আরও সহজ হতে পারে বলে এই পুনর্গঠনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
বড় প্রদেশগুলিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন বলে মনে করেন আসিম মুনির। ছোট প্রশাসনিক অঞ্চল তৈরি হলে সরকারি পরিষেবা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এই প্রস্তাবের পিছনে রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধ শুধু প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই দুই প্রদেশকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যেতে পারে বলে বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন প্রদেশগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রায় ১২.৮ কোটি মানুষের বাস। অন্যদিকে, আয়তনে বৃহত্তম বালুচিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এই বিপুল বৈষম্য প্রশাসনিক পুনর্গঠনের পক্ষে অন্যতম যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু পাঞ্জাব ও সিন্ধের রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে প্রদেশ ভাগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না। পাঞ্জাবে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (PML-N) এবং সিন্ধে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। ফলে সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
না। পাকিস্তানে আরও বেশি প্রদেশ এবং ছোট প্রশাসনিক অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব আগেও উঠেছে। পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবালও একাধিক প্রদেশ এবং ছোট প্রশাসনিক একক তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাধা রয়েছে। বিশেষ করে কোনও প্রদেশের সীমানা বদলাতে হলে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে। ফলে সেনাপ্রধানের ইচ্ছা থাকলেই এই পরিবর্তন কার্যকর করা সম্ভব নয়।
বালুচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিংসা, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এই প্রদেশকে ভাগ করার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, পাক-অধিকৃত কাশ্মীরেও প্রশাসন, মূল্যবৃদ্ধি, কর এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক মানচিত্র বদলানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা আরও জটিল হতে পারে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসতে পারে। ছোট প্রদেশ তৈরি হলে স্থানীয় স্তরে প্রশাসনিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হতে পারে। আবার বড় প্রদেশগুলির রাজনৈতিক শক্তি কমে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।