ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যে-ই হারুক না কেন, জিতবেন একজনই—বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। যে কোনও সমস্যা মারামারি করে মেটাতে বিশ্বাসী এই শাসকই ইজরায়েলের সবচেয়ে ধূর্ত রাজনৈতিক নেতা।
ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? আমেরিকা কি একতরফা জয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থামিয়ে দেবে? নাকি ইরান এই আকাশপথে হামলা সামলে টিকে থাকবে? যুদ্ধ শুরুর দু'সপ্তাহ পর এই প্রশ্নগুলোই উঠছে। উত্তর এখনও অজানা, তবে একটা বিষয় নিশ্চিত। এই যুদ্ধে যে-ই হারুক, জিতবেন একজনই—বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
28
আসলে এই যুদ্ধটা নেতানিয়াহুরই প্রজেক্ট, তাঁর বহু দশকের স্বপ্ন। নেতানিয়াহুই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তিকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছেন। কূটনীতি আর হুমকির মাঝে দোদুল্যমান ট্রাম্পকে তিনিই যুদ্ধে নামান। তিনি ট্রাম্পকে বোঝান যে ভেনেজুয়েলার মতো ইরানকেও সহজে ফেলে দেওয়া যাবে। এখন ট্রাম্প বুঝতে পারছেন, এটা একটা বড় ফাঁদ ছিল। আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী হাওয়া বইছে, অর্থনীতি সংকটে। নেতানিয়াহু কিন্তু হাসছেন, কারণ যে কোনও পরাজয়ই তাঁর জন্য জয়।
38
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর কলামিস্ট মিরাভ জোনজেসিন যেমনটা বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তেই নেতানিয়াহু জিতে গেছেন। এটা ইজরায়েলের লাভের জন্য নয়, বরং তিনি যা চেয়েছিলেন, সেটাই করতে পেরেছেন। ইরান আত্মসমর্পণ করলে তিনি দাবি করবেন, কূটনীতি যেখানে ব্যর্থ, সেনা সেখানে সফল। ইরান দুর্বল হলে বলবেন, তাদের পরমাণু শক্তি কমাতে পেরেছেন। এমনকি ইরান জিতলেও নেতানিয়াহু নিজের জয় দাবি করবেন। তিনি প্রমাণ করবেন যে ইরানকে ধ্বংস করার তাঁর যুক্তিই সঠিক ছিল।
নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত জয় হলেও, দেশ হিসেবে ইজরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ খুব একটা লাভজনক হবে না। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, অস্ত্র দিয়ে শান্তি আসে না। পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক আধিপত্য ইজরায়েলকে নিরাপত্তা দেবে না, বরং রাজনৈতিকভাবে তারা আরও একা হয়ে পড়বে। উপসাগরীয় দেশগুলিতে ইজরায়েল-বিরোধী মনোভাব বেশ শক্তিশালী এবং তারা জানে এই যুদ্ধের পিছনে নেতানিয়াহুই রয়েছেন। ফলে আমেরিকার সঙ্গেও তাদের দূরত্ব বাড়তে পারে।
58
আমেরিকাতেও ইজরায়েল-বিরোধিতা বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজা ইস্যুতেই এই মনোভাব বদলাতে শুরু করে। ট্রাম্পের সমর্থক অনেক 'মাগা' ইনফ্লুয়েন্সারও এখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তাঁরা বলছেন, ট্রাম্প ইজরায়েলের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন। কুইনিপিয়াক সমীক্ষা অনুযায়ী, ৪৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন আমেরিকা ইজরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন করছে। গ্যালাপ পোলে দেখা গেছে, ১৭ শতাংশ রিপাবলিকানও একই কথা মনে করেন।
68
তাহলে নেতানিয়াহু কেন এত মরিয়া হয়ে নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করতে চাইছেন? যুদ্ধের আগে তাঁর অবস্থা জানলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ইজরায়েলে নির্বাচনের আগে তাঁর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানিতে ছিল। গুরুতর ফৌজদারি মামলা শেষ পর্যায়ে। তার উপর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
78
এর আগে, হামাসের হামলার পর থেকেই জনতা তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। মোসাদ এবং সেনার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। পরে গাজায় নৃশংস সামরিক অভিযানের জন্য গোটা বিশ্ব তাঁর বিরোধিতা করে। এর মধ্যেই তিনি আমেরিকাকে সঙ্গে নিয়ে ইরানকে আক্রমণ করতে যান। খলনায়ক থেকে নায়ক হওয়ার সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগান নেতানিয়াহু। সম্প্রতি ইজরায়েলের আদালত তাঁর বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলার শুনানি স্থগিত রাখার আর্জি খারিজ করে দিয়েছে।
88
২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর 'নিউ ইয়র্ক টাইমস ডিলবুক সামিট'-এ নেতানিয়াহু বলেছিলেন, 'ইতিহাস যখন হাতের মুঠোয়, তখন পিছিয়ে নয়, এগিয়ে আসতে হয়।' কেন তিনি যুদ্ধ বাধালেন, তার উত্তর এই কথাতেই আছে। ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন ইজরায়েলে তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মতো কেউ নেই। ২০১০ ও ২০১১ সালে যখন তিনি ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, তখন দেশের নিরাপত্তা প্রধানরাই তাঁর বিরোধিতা করেন। কিন্তু এখন আর কোনও বিরোধী স্বর নেই। নেতানিয়াহুর বিশ্বাস, যুদ্ধ জিতুক বা হারুক, তাঁর প্রতি সমর্থন কমবে না।