
চিনের রাজনীতি আর সেনাবাহিনীতে ব্যাপক হুলস্থূল পড়ে গিয়েছে। দেশের দুই প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দুর্নীতির মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এক নতুন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য সামনে এল। এখন এই মামলা আর শুধু দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এতে 'বিশ্বাসঘাতকতা' এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর ইঙ্গিতও মিলছে।
চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের এই নতুন তথ্যে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। প্রশ্ন উঠছে, ২০২৩ সালে কি চিনের ক্ষমতার অন্দরে কোনও বড় রাজনৈতিক সংঘাত চলছিল? আর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিরুদ্ধে কি পর্দার আড়ালে কোনও ক্ষমতার লড়াই হয়েছিল?
বৃহস্পতিবার চিনের একটি আদালত প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংহে এবং লি শাংফুকে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। চিনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম এত উঁচু পদে থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে এত কঠোর পদক্ষেপ দেখা গেল। এই রায় চিনের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। প্রথমে এটিকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেখানো হলেও, এখনকার নতুন রিপোর্ট পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
চিনের সরকারি সংবাদপত্র 'পিএলএ ডেইলি' তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, দুই প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া এই শাস্তি সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের জন্য একটি কড়া বার্তা। সংবাদপত্রে লেখা হয়েছে, "এখন থেকে কোনও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাই বিশ্বাসঘাতকতার কথা ভাবার সাহস দেখাবে না।" এই প্রথম চিনের সরকার বা সরকারি মিডিয়া এই মামলাকে শুধু দুর্নীতি নয়, বরং "আনুগত্যের অভাব" এবং "বিশ্বাসভঙ্গ"-এর সঙ্গে जोड़ল।
ওয়েই ফেংহে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। তাঁর পরে লি শাংফুকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই বছরে দুই নেতার পদচ্যুতি এবং এখন 'বিশ্বাসঘাতকতা'-র মতো শব্দের ব্যবহার অনেক প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু আর্থিক দুর্নীতির নয়, বরং ক্ষমতার অন্দরের গভীর মতবিরোধের ইঙ্গিত হতে পারে। সরকারি সংবাদপত্রটি লিখেছে, "সিনিয়র পার্টি এবং সামরিক নেতা হিসেবে ওয়েই ফেংহে এবং লি শাংফু বিশ্বাসের পতন এবং আনুগত্যের অভাব দেখিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের মূল দায়িত্ব এবং পার্টির নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।"
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, "যাঁদের হাতে অস্ত্র থাকে, তাঁদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হল অনুগত থাকা।" চিনের সর্বোচ্চ সামরিক সংস্থার পক্ষ থেকে এই রায়ে "ঝংচেং শিজিয়ে" অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই সেনাবাহিনীর উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ মজবুত করার চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের পদক্ষেপকে ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
চিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সেনাবাহিনী সংক্রান্ত বিষয়ে স্বচ্ছতা বরাবরই সীমিত। তাই এই পুরো ঘটনা বিশ্বজুড়ে রণকৌশল বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই যে, এটা কি শুধুই দুর্নীতির মামলা, নাকি চিনের ক্ষমতার অন্দরে চলা কোনও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত?