
দৌড় শেষ হতে তখনও বাকি প্রায় আট কিলোমিটার। ঠিক সেই সময়ই শুরু হয় ঋতুস্রাব। তীব্র পেটব্যথা, রক্তে ভিজে যায় ট্র্যাকস্যুট। এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মানুষ হয়তো দৌড় থামিয়ে দিতেন। কিন্তু থামেননি চিনের ম্যারাথন দৌড়বিদ লি মেইঝেন। সমস্ত শারীরিক কষ্টকে উপেক্ষা করে তিনি ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করেন। ২০২৪ সালের হেংশুই লেক ম্যারাথন-এর সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ফের সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
লি মেইঝেন ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ৭ সেকেন্ডে ম্যারাথন শেষ করেন। শারীরিক অস্বস্তি ও যন্ত্রণা সত্ত্বেও তিনি প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াননি। তাঁর এই মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াইয়ের মনোভাব বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
১৯৯৯ সালের ৩ জানুয়ারি চিনের ফুজিয়ান প্রদেশের লংইয়ান শহরে জন্ম লি মেইঝেনের। খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর পরিবারের কোনও যোগ ছিল না। বাবা-মা একটি স্থানীয় রেস্তরাঁ ও অতিথিশালা পরিচালনা করতেন।
স্কুলজীবনে পঞ্চম শ্রেণিতে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার পরই তাঁর প্রতিভা নজরে আসে। এরপর তিনি সাংহাই ইউনিভার্সিটি অব স্পোর্টে পড়াশোনা করেন এবং পরে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর পেশাদার ম্যারাথন দৌড়ের পথচলা।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে লি মেইঝেন ডংজি নিউ ইয়ার ম্যারাথন, উক্সি ম্যারাথন, শিয়ামেন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি ম্যারাথন এবং CAA ১০ কিলোমিটার এলিট রেস-সহ একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। তবে হেংশুই লেক ম্যারাথনের ঘটনাই তাঁকে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ভাইরাল ভিডিও দেখে অসংখ্য মানুষ লি-র সাহসের প্রশংসা করেছেন।
একজন নেটিজেন লেখেন, "এটা লজ্জার কিছু নয়। প্রতি মাসেই অসংখ্য নারী এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। ঋতুস্রাব জীবনের স্বাভাবিক অংশ।"
আরেকজনের মন্তব্য, "এই সাহসী মহিলাকে স্যালুট। প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে লুকিয়ে রাখার নয়, সম্মান করার সময় এসেছে।"
আরও এক ব্যবহারকারী লেখেন, "ঋতুস্রাবের সময় শরীর কতটা দুর্বল হয়ে পড়ে, তা জানি। এই পারফরম্যান্স শুধু শারীরিক নয়, মানসিক শক্তিরও অসাধারণ উদাহরণ।"
তবে সবাই যে তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন, তা নয়। একজন নেটিজেন মন্তব্য করেন, "এই অবস্থায় দৌড় শেষ করা সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু আমি হলে নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে মাঝপথেই থেমে যেতাম।"
সমালোচনার জবাবে লি মেইঝেন বলেন, "আমি যদি মাঝপথে দৌড় ছেড়ে দিতাম, তাহলে আমাকে আবার একটি ম্যারাথন দৌড়াতে হতো।"
তিনি আরও জানান, "ফলাফল ভালো না হলেও আমার সমস্যা ছিল না। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করা।"
লি মেইঝেনের এই লড়াই অনেকের কাছেই ভারতীয় আল্ট্রা রানার সুফিয়া সুফি খান-এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। পায়ে চোট থাকা সত্ত্বেও সুফিয়া ৮৭ দিনে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত প্রায় ৪,০৩৫ কিলোমিটার দৌড়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছিলেন।
Chinese marathon runner li meizhen got her period mid-race.
She didn't let it stop her from finishing pic.twitter.com/6vvmDzMI2n— Interesting things (@awkwardgoogle) July 22, 2026
লি মেইঝেনের গল্প আবারও মনে করিয়ে দিল, খেলাধুলা শুধু জয়ের লড়াই নয়, নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার নামও। তাঁর এই দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।