
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির কোনও আশার আলো নেই। বরং পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবচেয়ে বিপজ্জনক ও বড় ধরনের হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন ইরানকে। তিনি বলেছেন, ইরান যদি আন্তরিক আলোচনায় না বসে, তবে যুক্তরাষ্ট্র একটি পুরোপুরি হামলা চালাতে পারে। এই হুমকি এমন এক সময়ে এসেছে যখন জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যেই ভেঙে গেছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ নিয়ে ইরানের হুমকি পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ইরানের উপর এখনও যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনী টানা কয়েক রাত ধরে ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। ইজরায়েলও প্রস্তুত রয়েছে। যদিও ট্রাম্প বলছেন এই মুহূর্তে এর প্রয়োজন হবে না। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা পুরো বিশ্বের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই-সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ইরানি নেতা নিহত হন। পাল্টা ইজরায়েলি ও মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে এর প্রতিশোধ নেয় ইরান। লেবাননের হিজবুল্লাও ইজরায়েলের উপর তাদের হামলা জোরদার করে। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা চরমে পৌঁছয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। জুনে উত্তেজনা আবার বেড়ে যায় যখন ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালায়। জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এশিয়া, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে তাদের রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বিবেচনা করে।
ট্রাম্পের হুমকি: কৌশল নাকি ধাপ্পাবাজি?
ট্রাম্পের বিদেশনীতি বরাবরই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের। তিনি এর আগেও ইরানকে প্রস্তর যুগে ফেরত পাঠানো এবং সভ্যতা ধ্বংস করার মতো ভয়াবহ হুমকি দিয়েছেন। এবার তিনি হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি গুরুত্ব সহকারে পদক্ষেপ না নেয়, তবে পুরোদমে হামলা চালানো হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই হুমকি আংশিকভাবে নির্বাচনী এবং কৌশলগত। ট্রাম্প ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ করতে এবং হিজবুল্লা ও হামাসের মতো এই অঞ্চলের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করতে বাধ্য করতে চান। অন্যদিকে, তিনি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কাতার) সন্তুষ্ট রাখতে চান। তবে, অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে একটি ধাপ্পাবাজি বলে মনে করেন, কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অর্থ হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের ক্ষতি – সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, তেলের দামের বৃদ্ধি এবং একটি সম্ভাব্য নতুন শরণার্থী সঙ্কট।
ইরানের পরিস্থিতি ও কৌশল
ইরান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কিন্তু সামরিকভাবে প্রস্তুত। তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। এটি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। ইরান বলে যে, আক্রান্ত হলে এটি পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। ইরান হিজবুল্লা, হুথি এবং অন্যান্য প্রক্সি বাহিনীর একটি নেটওয়ার্ক বজায় রাখে। লেবাননের ২০১৬ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লা সক্রিয় ছিল। তবে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও উত্তেজনা এখনও বেশি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: তিনটি প্রধান পরিস্থিতি রয়েছে: কূটনৈতিক সমাধান – পাকিস্তান বা অন্য দেশের মাধ্যমে আলোচনা সফল হয়। একটি নতুন চুক্তি সম্পাদিত হয়। সীমিত হামলা – যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক হামলা চালায় কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলে। পুরোদস্তুর যুদ্ধই সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকল্প, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে। ট্রাম্পের নীতি হল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। তিনি একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত চান। কিন্তু যুদ্ধের জটিলতা অপরিসীম।
শান্তির পথ এখনও দীর্ঘ। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। ট্রাম্পের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করা এক জিনিস, কিন্তু পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। বিশ্ব বর্তমানে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানের আশা করছে। হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা, তেল সরবরাহ বজায় রাখা এবং একটি নতুন বড় সংঘাত এড়ানোই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু ইতিহাস দেখায় যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গও বড় আগুনে পরিণত হতে পারে।