
পশ্চিম এশিয়ায় যখন যুদ্ধের আঁচ ক্রমশ বাড়ছে, ঠিক তখনই শত্রুদের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। বৃহস্পতিবার তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের মাটিতে কেউ স্থলপথে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করলে তার ফল হবে মারাত্মক। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি এই খবর জানিয়েছে।
ফার্স নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট অনুযায়ী, হাতামি বলেছেন যে শত্রুপক্ষ যদি স্থলপথে হামলা চালায়, তবে "একজনও প্রাণে বাঁচবে না"। বিশেষ করে এই অঞ্চলে আমেরিকা ও ইজরায়েলি বাহিনীর সম্ভাব্য আগ্রাসনের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন তিনি। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে সামরিক জবাব আরও তীব্র করতে তারা প্রস্তুত। ফার্স নিউজ এজেন্সিকে তিনি বলেন, "যদি শত্রু দেশ স্থলপথে অভিযান চালায়, তাহলে তাদের একজনও প্রাণে বাঁচতে পারবে না।"
ইরানের সেনাপ্রধান আরও জোর দিয়ে বলেন, দেশের সশস্ত্র বাহিনী আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—দুই ক্ষেত্রেই যেকোনও ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শত্রুদের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "অত্যন্ত সন্দেহ ও সতর্কতার সঙ্গে" প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে এবং সঠিক সময়ে পাল্টা কৌশল কার্যকর করতে হবে।
জেনারেল হাতামি পুনরায় বলেন, ইরানের মূল সামরিক কৌশল হলো দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাইরের হুমকি প্রতিহত করা। তিনি যোগ করেন, যতক্ষণ না তাঁদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ ইরান তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, "ইরানের সেনাবাহিনী শত্রুর যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা, দুই ক্ষেত্রেই প্রস্তুত। শত্রুদের গতিবিধি ও কার্যকলাপের ওপর প্রতি মুহূর্তে কড়া নজর রাখতে হবে এবং সঠিক সময়ে শত্রুর হামলার পদ্ধতি মোকাবিলার জন্য পরিকল্পনা কার্যকর করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "ইসলামিক ইরানের রণকৌশল স্পষ্ট: আমাদের দেশ থেকে যুদ্ধের ছায়া সরাতেই হবে এবং সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এমনটা হতে পারে না যে কিছু জায়গা সুরক্ষিত থাকবে আর আমাদের দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা শত্রুদের ছাড়ব না।"
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা চরমে। একদিকে ইরান এবং অন্যদিকে আমেরিকা-ইজরায়েল জোটের মধ্যে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে সোমবার হোয়াইট হাউস জানায়, পশ্চিম এশিয়ায় অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে যাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি অনুযায়ী সবরকম ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পান। তেহরানের সঙ্গে সংঘাত শেষ করার জন্য আলোচনা চললেও আমেরিকা সামরিক বিকল্প খোলা রাখছে।
এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে যুদ্ধ চলাকালীন কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখার জন্যই এই পদক্ষেপ। তবে এর পাশাপাশি কূটনৈতিক স্তরেও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
লেভিট বলেন, "প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাহিনীর বিষয়ে 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-র লক্ষ্য পূরণের দিকে মনোনিবেশ করেছেন। কমান্ডার-ইন-চিফের জন্য সবরকম বিকল্প তৈরি রাখা পেন্টাগনের কাজ।" প্রেস সেক্রেটারি আরও জানান, প্রেসিডেন্টকে সম্ভাব্য স্থল অভিযান নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।
তিনি যোগ করেন, "প্রেসিডেন্টকে একাধিকবার স্থল অভিযানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। তিনি কখনোই সেই সম্ভাবনা নাকচ করেননি। প্রেসিডেন্টের জন্য সব বিকল্প খোলা রাখা পেন্টাগনের দায়িত্ব। এর মানে এই নয় যে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বা তিনি সংবাদমাধ্যমকে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন, যাতে আমাদের শত্রুরা সতর্ক হয়ে যায়।"
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, পেন্টাগন ইরানে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দ্য পোস্ট জানিয়েছে, ট্রাম্প যদি সংঘাত আরও তীব্র করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে এই প্রস্তুতি একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করার জন্য।
এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে ধরনের স্থল অভিযানের কথা ভাবা হচ্ছে, তা সম্ভবত পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন হবে না। বরং, স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স এবং সাধারণ পদাতিক বাহিনীর সম্মিলিত দল নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছোট ছোট অভিযান চালাতে পারে।
এদিকে, আমেরিকার অন্যতম বড় উভচর অ্যাসল্ট জাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি প্রায় ৩,৫০০ মেরিন ও সৈন্য নিয়ে মার্কিন সেন্টকম এলাকায় প্রবেশ করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে পশ্চিম এশিয়ার সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার উপস্থিতি আরও বাড়ল।