সেন্ট পিটার্সবার্গে এক বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন চাপ সত্ত্বেও মোদী দেশের স্বার্থে কাজ করেন এবং কারও কাছে মাথা নত করেন না। পুতিনের এই মন্তব্যে কি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন কোনও সমীকরণ তৈরি হচ্ছে? সত্যিই কি ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে?
সেন্ট পিটার্সবার্গ / নতুন দিল্লি: বিশ্ব রাজনীতির দাবা খেলায় কি নতুন কোনও চাল দেওয়া হল? রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের এক বৈঠকে যখন বিশ্বের তাবড় সংবাদ সংস্থার কর্তারা একজোট হয়েছিলেন, তখন কেউই ভাবেননি যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এমন মন্তব্য করবেন যা সরাসরি ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। পুতিন শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের প্রশংসাই করেননি, বরং পশ্চিমী দেশগুলোর সেই গোপন পরিকল্পনাও ফাঁস করে দিয়েছেন যা দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে তৈরি হচ্ছিল। এই বিবৃতির পর বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।

'উনি ঝুঁকবেন না...': ওয়াশিংটনের গোপন চাপের কথা ফাঁস করলেন পুতিন!
বৈঠকের সময় সাংবাদিকরা যখন ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং তাতে আমেরিকার আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন পুতিন কোনও রাখঢাক না করে সরাসরি আক্রমণে যান। তিনি স্বীকার করেন যে আমেরিকা এবং তার পশ্চিমী সহযোগীরা নয়াদিল্লির উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে ভারত রাশিয়ার থেকে দূরত্ব তৈরি করে এবং বিশেষ করে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ঠিক এই সময়েই পুতিন এমন একটি তথ্য প্রকাশ করেন যা পশ্চিমী रणनीतिकারদের होश উড়িয়ে দিয়েছে।

পুতিন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন: "আমার মনে হয়, এতদিনে সবাই এটা বুঝে গিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী মোদীর মতো নেতাকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করাটা একেবারেই অর্থহীন। তিনি দেড়শো কোটি ভারতীয়র স্বার্থে নিজে সিদ্ধান্ত নেন এবং কোনও বাইরের শক্তির সামনে মাথা নত করেন না।" পুতিন স্পষ্ট করে দেন যে আমেরিকার এই চাপসৃষ্টির কৌশল শুধু ব্যর্থই হচ্ছে না, বরং এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কে কি কোনও বিপদের আশঙ্কা ছিল?
পশ্চিমী দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বারবার এই প্রশ্ন উঠেছে যে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক কি এর ফলে প্রভাবিত হবে? কিন্তু পুতিন এই সমস্ত আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে মস্কো এবং নয়াদিল্লির সম্পর্কে কোনও বিপদ নেই। তাঁর কথায়, ভারত অন্যান্য দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক বাড়াতেই পারে, কিন্তু তাতে রাশিয়া-ভারত বন্ধুত্ব দুর্বল হবে না। রাশিয়া ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী সঙ্গী হিসেবেই দেখে।
$100 বিলিয়নের লক্ষ্য: আমেরিকার 'চক্রব্যূহ' কি ব্যর্থ হল?
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় চমক হল ভারত-রাশিয়ার মধ্যে আসন্ন অর্থনৈতিক চুক্তি। গত কয়েক বছরে ভারত একদিকে যেমন আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক মজবুত করেছে, তেমনই অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে তার পুরনো এবং পরীক্ষিত সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। ওয়াশিংটন আশা করেছিল যে ভারতকে নিজের দিকে টেনে মস্কোকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করে দেবে, কিন্তু পুতিনের নতুন ঘোষণায় সেই 'চক্রব্যূহ' ভেঙে গিয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেছেন যে ভারত যে কোনও দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বাড়াক না কেন, তাতে রাশিয়ার কোনও চিন্তা বা বিপদ নেই। তিনি একটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান দিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক পার করতে পারে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে বাইরের শক্তির চাপ সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে চলেছে।
ব্রিকস (BRICS) এবং তেলের গ্যারান্টি: পর্দার আড়ালের আসল গল্প
এই বড় ঘোষণার পিছনে আরও একটি গভীর কূটনৈতিক দিক লুকিয়ে আছে, যা আসন্ন ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত। একদিকে পুতিন যেমন রাশিয়া ও চিনের সম্পর্ককে বিশ্ব রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার এক অভূতপূর্ব শক্তি বলে বর্ণনা করেছেন, তেমনই অন্যদিকে ভারতকে জ্বালানি সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় আশ্বাস দিয়েছেন।

ওয়াশিংটনের প্রবল বিরোধিতা এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকির মধ্যেও রাশিয়া ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেছে যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা যতই বাড়ুক না কেন, ভারতের জ্বালানি স্বার্থে কোনও আঁচ আসতে দেওয়া হবে না। রাশিয়া তার তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি সব অবস্থাতেই পূরণ করবে। এখন গোটা বিশ্বের নজর আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের দিকে, যেখানে বিশ্ব নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং একটি 'বহুমেরু বিশ্ব ব্যবস্থা' (Multipolar World Order) তৈরির ভিত্তি স্থাপন হওয়ার কথা। পুতিনের এই হুঙ্কার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভারতকে তার জাতীয় স্বার্থ থেকে সরানো এখন আর কোনও মহাশক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।


