
আমেরিকা আর ইরানের যুদ্ধ ক্রমশই ভয়ঙ্কর আকার নিচ্ছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রামগত হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছে। কিন্তু এবার পিছিয়ে নেই ইরানও। এবার প্রকাশ্যে এল ইরানের লম্বা হিটলিস্টের তালিকা। যা তাদের সুপ্রিম নেতা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর পরেই তৈরি করা হয়েছিল। ৬ দিনব্যাপী আন্ত্যেষ্টিক্রায়া অনুষ্ঠানের পর বর্তমান সুপ্রিম নেতা মোজতাবা আলি খামেনেইর প্রথম প্রকাশ্য বার্তার সঙ্গেই প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, মোজতাবা ৯০%ই শেষ হয়ে গিয়েছে।
ইরানের হিটলিস্টের যে তালিকা প্রকাশ্যে এসেছে তাতে ১৩ জনের নাম রয়েছে। ১০ জন বিদেশি নেতার নাম রয়েছে। যারমধ্যে প্রথমেই রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম। দ্বিতীয় নাম ব্রিটিশ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এনামুয়েল ম্যাক্রোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলেনি, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ। মার্কিন পদাধিকারীদের নামও রয়েছে। তালিকায় রয়েছে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মার্কিন প্রতিরক্ষমন্ত্রী পিট হেগসেথ। বিবৃতিতে মোজতাবা বলেছেন, 'প্রতিশোধ আমাদের জাতির ইচ্ছে। এবং তা অবশ্যই কার্যকর করতে হবে।' তিনি আরও বলেছেন, এই অপরাধীরা যাদের নাম একটি তালিকায় রয়েছে তারা নিজেদের বিছানায় শান্তিপূর্ণ মৃত্যুর আকাঙ্খা নিয়ে কবরে যাবে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে পুরোপুরি নির্মূল করে দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহান্তে ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার পর ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক দাবি সামনে এল। তিনি বলেছেন, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি '৯০ শতাংশ শেষ'।
সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি জানান, আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে বলেন, "ওদের নৌবাহিনী নেই। বিমানবাহিনী নেই। সব শেষ। ওদের অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট সিস্টেমও শেষ। ওদের সব নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে।" তেহরানের নেতৃত্বে যে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এই অভিযানে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডারদের নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, "ওদের সেরা নেতাদের মেরে ফেলা হয়েছে। তারা শেষ। খোমেনিও শেষ।" এখানে তিনি সম্ভবত আলি খামেনির কথাই বলতে চেয়েছেন, যিনি ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আমেরিকা-ইজরায়েলের বিমান হানার প্রথম ঢেউয়ে মারা যান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন যে, মোজতবা খামেনি, যাঁকে তাঁর প্রয়াত বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ভাবা হচ্ছিল, তিনিও এই সামরিক অভিযানে গুরুতর জখম হয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, মোজতবা '৯০ শতাংশ শেষ'।
খবর অনুযায়ী, ছোট খামেনি আগের এক বিমান হামলায় পাওয়া গুরুতর আঘাত থেকে সেরে ওঠার চেষ্টা করছেন। এই মাসের শুরুতে ইরান ও ইরাক জুড়ে হওয়া হাই-প্রোফাইল শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়নি।
এই সমস্ত ঘটনা এমন একটা সময়ে ঘটছে যখন সপ্তাহান্তে ওয়াশিংটন আর তেহরান নতুন করে মিসাইল হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলের অস্থিরতা এক নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সামরিক চাপের পাশাপাশি ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে ওয়াশিংটন সক্রিয়ভাবে একটি 'ইরানিয়ান ব্লকেড' কার্যকর করবে। একই সঙ্গে, বাণিজ্যিক জাহাজ সংস্থাগুলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সুরক্ষিত রাখার জন্য আমেরিকাকে টাকা দিতে হবে।
এই নীতির কথা ট্রাম্প প্রথম তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টের একটি পোস্টে জানান। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনী 'হরমুজ প্রণালীর অভিভাবক'-এর ভূমিকা নেবে।
ট্রাম্প প্ল্যাটফর্মে লেখেন, "হরমুজ প্রণালী খোলা আছে, এবং ইরান থাকুক বা না থাকুক, এটা খোলাই থাকবে। আমরা 'ইরানিয়ান ব্লকেড' আবার চালু করছি, কারণ এটা শুধু ইরানের জাহাজ বা তাদের গ্রাহকদের ঢোকা বা বেরোনো আটকাচ্ছে। বাকি সব দেশ এই প্রণালী স্বচ্ছভাবে ও খোলাখুলি ব্যবহার করতে পারবে।"
তিনি যুক্তি দেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সঙ্গীদের আমেরিকার নিরাপত্তা অভিযানের আর্থিক ভার ভাগ করে নিতে হবে। এর জন্য তিনি ওই পথে যাওয়া সমস্ত পণ্যের মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
এই একতরফা প্রস্তাবের জবাবে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের আর্থিক দাবি খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি পাল্টা বলেন যে, ওয়াশিংটন নয়, বরং তেহরানেরই এই জলপথ সুরক্ষিত রাখার ঐতিহাসিক এবং আইনি অধিকার রয়েছে।
আরাঘচি সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত এক জবাবে বলেন, "ইরান বরাবরই এই প্রণালীর অভিভাবক ছিল এবং চিরকাল থাকবে। ২০% অবশ্যই অনেক বেশি। আমরা ন্যায্য বিচার করব।"
ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এই কথার লড়াই এক দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই দেশের রাজধানীই হরমুজ প্রণালীর প্রশাসন এবং সুরক্ষার ওপর নিজেদের দাবি জানাচ্ছে। এই প্রণালী বিশ্বের শক্তি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উপসাগর জুড়ে সামরিক অভিযান ক্রমশ বাড়ছে।