
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে ইরানের সংবাদপত্রগুলো রীতিমতো উৎসব করছে। 'হামশাহরি' নামের একটি পত্রিকা তো আরও এক ধাপ এগিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং অন্য আমেরিকান কর্মকর্তাদের 'আকস্মিক মৃত্যুর' জন্য তৈরি থাকতে বলে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, ইরানের এক সংবাদ মাধ্যমে উপস্থাপিকা লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে এতটাই উল্লসিত যে সেই খবর অনলাইনেই তিনি দুইবার পড়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, যে এই খবর এতটাই সুন্দর যে দুইবার পড়তে ইচ্ছে করছে তার।
ইরানের সংবাদপত্রে উল্লাস
হামশাহরি পত্রিকাটির প্রথম পাতায় একটি ছবি ছাপা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিন্ডসে গ্রাহামের একটি ছবির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। পাশে মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং আমেরিকা ও ইজরায়েলের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের ছবিও রয়েছে। এই ছবির উপরেই বড় বড় করে শিরোনাম লেখা হয়েছে, "আকস্মিক মৃত্যুর জন্য তৈরি থাকো"।
একইভাবে, 'ভাতান-এ-এমরুজ' নামের আরেকটি ইরানি পত্রিকা ১৩ জুলাই তাদের প্রথম পাতায় গ্রাহামের মৃত্যুর খবর ছাপে। তাদের শিরোনাম ছিল 'মৃত্যুর সওদাগরের মৃত্যু'। পত্রিকাটি বিস্তারিতভাবে লেখে, এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতির অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন এবং তিনি 'হঠাৎ অসুস্থতা'র পর মারা গেছেন।
তেহরানের হুমকি আমেরিকাকে
তেহরানের এই হুমকির সুর আরও চড়িয়েছেন ইরানের সরকারি মিডিয়ার এক সংবাদ পাঠক। তিনি গ্রাহামের মৃত্যুকে ইরানের কৃতিত্ব হিসেবে ইঙ্গিত করে বলেন: "যুদ্ধবাজ, ইরান-বিরোধী মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জাহান্নামে যাওয়ায় আমি ইরানি জাতিকে অভিনন্দন জানাই।"
ইরানের মিডিয়ার এই ধরনের প্রচারণার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠী 'MAGA'-র মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আরও জোরালো হয়েছে। অনেকেই গ্রাহামের মৃত্যুর তদন্তের দাবি তুলেছেন। তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এর আগে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) গ্রাহামকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল।
তেহরানের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণ হল, গ্রাহাম বরাবরই আমেরিকার আগ্রাসী বিদেশ নীতির একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন।
লিন্ডসে গ্রাহাম
সাউথ ক্যারোলিনার এই সেনেট লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করতেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার পক্ষে ছিলেন, গাজা সংঘাতের সময় ইজরায়েলকে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন এবং বারবার বলতেন যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে সরানো উচিত। তিনি এর আগে গাজায় ইজরায়েলের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারকেও সমর্থন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া সেই সংঘাত এক বছর পর হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পরেও চলছিল।
শুধু তাই নয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর গ্রাহাম খোলাখুলিভাবে ইরান সরকারকে উৎখাত করার ডাক দিয়েছিলেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেছিলেন, এই কাজের জন্য যে আর্থিক খরচ হবে, তা সার্থক। তার মতে, ইরানের সরকারের পতন হলে মধ্যপ্রাচ্যের ছবিটাই বদলে যাবে এবং বিরাট অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রাহাম বেশ কয়েকবার ইজরায়েল সফর করেন এবং সেদেশের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দেখা করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, এই বৈঠকগুলো থেকে তিনি এমন কিছু তথ্য পেয়েছেন যা তার নিজের সরকারও তাকে জানায়নি।
'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রাহাম সেই সফরের সময় ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও আলোচনা করেন। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কীভাবে রাজি করানো যায়, সেই বিষয়ে তিনি নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দেন। গ্রাহাম পরে দাবি করেন যে, নেতানিয়াহুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ট্রাম্প যৌথ সামরিক অভিযানে সমর্থন দিতে রাজি হন।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই সেনেটর সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই দুটি দেশের সেই ক্ষমতা রয়েছে। যদিও সম্প্রতি সৌদি আরব এই সংঘাত থেকে দূরে থাকায় তিনি তাদের সমালোচনাও করেন।